প্রাচীন ভারতের কুষাণ রাজবংশের ইতিহাস

মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের পর দক্ষিণ ভারতে ভারতীয় রাজবংশ সাতবাহনদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। ঠিক এই সময়েই উত্তর ভারতে একের পর এক গ্রিক, শক, পহ্লব প্রভৃতি বিদেশিদের আক্রমণ সংঘটিত হতে থাকে এবং আর্যাবর্তের বিভিন্ন অংশে তাদের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। এইসব বিদেশিদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা উল্লেখযােগ্য ছিল কুষাণ -রা। উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম ভারতের এক বিশাল অংশে তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ভারত ও মধ্য এশিয়ার এক বিস্তীর্ণ অঞ্চল নিয়ে গড়ে ওঠে কুষাণ সাম্রাজ্য। ভারতীয় ও বহির্ভারতীয় সংস্কৃতির মধ্যে ঘনিষ্ঠ যােগাযােগ স্থাপিত হয়। ভারত ইতিহাসে এক নব যুগের সূচনা হয়। ভারতের ইতিহাসে কুষাণ যুগের অবদন অনস্বীকার্য।

কুষাণ যুগের ইতিহাসের উপাদান: কুষাণ যুগের ইতিহাস রচনায় উপাদানের কোনও অভাব নেই। সাহিত্য, মুদ্রা, লিপি ও স্থাপত্য-ভাস্কর্য থেকে কুষাণ যুগের ইতিহাসের প্রচুর তথ্যাদি পাওয়া যায়। কুষাণ যুগের দেশি উপাদান এবং বিদেশি প্রচুর সাহিত্য-উপাদান পাওয়া গেছে। দেশীয় সাহিত্যের মধ্যে পুরাণ, কহূনের রাজতরঙ্গিনী, অশ্বঘােষের বুদ্ধচরিত, নাগার্জুনের মাধ্যমিক – সূত্র, বৌদ্ধগ্রন্থ মহাবস্তু ও দিব্যবদান উল্লেখযােগ্য। চিনা ঐতিহাসিক সু-মা-কিয়েন রচিত সি-চি, পান-কু রচিত সিয়েন-হান-সু, ফান-ই রচিত হৌ হান-শু গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে স্বীকৃত। চিনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ -এর বিবরণী কুষাণ ইতিহাস জানতে সাহায্য করে। স্ট্রাবাে, জাস্টিন ও বর্দেসানিস -এর রচনা থেকে কুষাণদের আদি ইতিহাস জানা যায়। কৌশাম্বী, সারনাথ, সুইবিহার এবং ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রাপ্ত লিপিগুলি কুষাণ ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এই লিপিগুলি ব্রাহ্মী ও খরােষ্ঠী লিপি এবং প্রাকৃত ভাষায় রচিত। কুষাণদের ইতিহাস রচনায় মুদ্রার গুরুত্ব খুবই বেশি। এগুলি থেকে কেবলমাত্র কুষাণ রাজাদের কালপঞ্জিই নয় — তাদের ধর্মবিশ্বাস, ব্যবসা-বাণিজ্য প্রভৃতির কথাও জানা যায়। কুষাণ যুগের স্তুপ, চৈত্য, প্রাসাদ, মূর্তি প্রভৃতি থেকে কেবলমাত্র কুষাণ যুগের শিল্পকলাই নয় — রাজাদের ধর্মবিশ্বাস এবং দেশের আর্থিক অবস্থার কথাও জানা যায়।

কুষাণ কারা: শক ও পহ্লবদের পর কুষাণ জাতি ভারতে প্রবেশ করে। কুষাণরা ছিল ইউ-চি নামে এক যাযাবর জাতির শাখা। তারা চীনের উত্তর-পশ্চিমাংশে অবস্থিত টুন হুয়াং ও ছি-লিয়েন পাহাড়ের (বর্তমান চিনের কান-সু অঞ্চলে টুন-হুয়াং ও নানলান পাহাড়) মধ্যবর্তী এলাকার অধিবাসী। আনুমানিক ১৬৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দে হিউং-নু (বা হুন) নামে অপর এক যাযাবর জাতি তাদের সে স্থান থেকে বিতাড়িত করে। তারা তখন দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হতে থাকে। এই সময় তারা উ-সুং নামে এক জাতি কর্তৃক আক্রান্ত হয়। যুদ্ধে উ-সুং -রা পরাজিত হয়। এরপর ইউ-চিরা আরও দক্ষিণে অগ্রসর হয়ে সিরদরিয়া অঞ্চলে উপস্থিত হয়। সেখানে শকরা বাস করত। ইউ-চিদের সঙ্গে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে শকরা ভারতের দিকে চলে গেলে ইউ-চিরা সেখানে বসতি স্থাপন করে। দীর্ঘ কুড়ি বছর তারা সেখানে বাস করে। এরপর হিউং-নুরা আবার তাদের আক্রমণ করলে তার সিরদরিয়া অঞ্চল ত্যাগ করে অক্ষু নদীর তীরে আমুদরিয়ায় বসতি স্থাপন করে। এই স্থানে বসবাসকালে তাদের মধ্যে দুটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে। তারা যাযাবর বৃত্তি ত্যাগ করে এই অঞ্চলে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে থাকে এবং পশুপালনের সঙ্গে সঙ্গে কৃষিকার্য শুরু করে। এই সময় ইউ-চি জাতি পাঁচটি শাখায় বিভক্ত হয়ে পড়ে। এই পাঁচটি শাখার মধ্যে কুষাণরা শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং ইউ-চি জাতির অন্যান্য শাখাগুলিকে ঐক্যবদ্ধ করতে সক্ষম হয়। এরপর থেকে ইউ-চিরা কুষাণ নামেই পরিচিত হয়।

কুষাণ বংশের ইতিহাস: চীনা ঐতিহাসিক সু-চিয়েন লিখেছেন, প্রথম কদফিসিস বা কুজল কারা কদফিসিস ইউ-চি জাতির সকল শাখাকে ঐক্যবদ্ধ করেন। পার্থিয়া, কাবুল, পেশােয়ার, কাশ্মীর প্রভৃতি অঞ্চল জয় করে পারস্যের সীমানা থেকে ভারতের উত্তর-পশ্চিমে সিন্ধুনদ পর্যন্ত তিনি রাজ্যবিস্তার করেছিলেন। কাবুল দখল করার ফলে তার ভারতে রাজ্যবিস্তারের পথ সুগম হয়। তিনি ভারতে প্রবেশ করেন নি—ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চলেই তার সাম্রাজ্য সীমাবদ্ধ ছিল ছিল। অনেকে মনে করেন যে তিনি বৌদ্ধধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন। সম্ভবত তিনি ১৫ থেকে ৬৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেন। এরপর তার ছেলে বিম কদফিসিস্ রাজা হয়েছিলেন। তিনি প্রচুর স্বর্ণমুদ্রা প্রবর্তন করেছিলেন। তিনি শিবের উপাসক ছিলেন। তিনি পাঞ্জাব ও গাঙ্গেয় উপত্যকা জয় করে তিনি বারাণসী পর্যন্ত কুষাণ সাম্রাজ্য বিস্তৃত করেন। তিনি ৬৫ থেকে ৭৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেন।

বিম কফিসিসের পর প্রথম কণিষ্ক কুষাণ সাম্রাজ্যের সিংহাসনে বসেন। তিনি কুষাণ বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্রাট ছিলেন। কণিষ্ক সিংহাসনে বসেছিলেন ৭৮ থেকে ১৪৪ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যবর্তী কোনাে এক সময়ে। এই ৭৮ খ্রিষ্টাব্দ থেকে নতুন একটা বর্ষ গণনা শুরু হয়, যার নাম শকাব্দ। কণিষ্ক -এর রাজধানী ছিল পুরুষপুর যা আধুনিক পেশােয়ারের কাছে। কণিষ্ক বৌদ্ধ ধর্মের পৃষ্ঠপােষক ছিলেন, তিনি কাশ্মীরে (মতান্তরে জলন্ধরে) চতুর্থ বৌদ্ধ সম্মেলন আয়োজন করেন। তাকে দ্বিতীয় অশোক বলা হয়। কণিষ্ক সম্ভবত মধ্য এশিয়ার কোনাে এক যুদ্ধক্ষেত্রে মারা যান। চীনা বিবরণ থেকে জানা যায়, এক জন কুষাণ রাজা হানবংশীয় এক রাজকুমারীকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন। তাকে সেনাপতি পান-চাও মধ্য-এশিয়া অভিযানের সময় প্রথম শতাব্দীর শেষভাগে যুদ্ধে পরাজিত করেন। কাহিনীটি যদি সত্যি হয় তাহলে উল্লিখিত রাজা ছিলেন বিম অথবা কণিষ্ক।

কণিষ্কর উত্তরাধিকারীরা আরাে ১৫০ বছর ধরে রাজত্ব করেছিলেন। ১০২ খ্রিস্টাব্দে কণিষ্কের মৃত্যুর তার পুত্র বাসিস্ক সিংহাসনে বসেন। তার আধিপত্য কেবলমাত্র মথুরা, পূর্ব মালব ও কাশ্মীরে সীমাবদ্ধ ছিল। অন্যান্য অঞ্চলগুলি তার হস্তচ্যুত হয়। তিনি কাশ্মীরে জয়স্বামীপুর ও জুস্কপুর নামে দুটি নগর প্রতিষ্ঠা করেন। এবং বহু মঠ ও চৈত্য নির্মাণ করেন। বাসিস্কের পর হুবিস্ক (১০৬-১৩৮ খ্রিঃ) সিংহাসনে বসেন। মথুরা ছাড়াও পূর্ব আফগানিস্তান, কাবুল ও পশ্চিম সীমান্তের কিছু কিছু অঞ্চলে তার মুদ্রা ও শিলালিপি পাওয়া গেছে। তিনি মহারাজ রাজাধিরাজ দেবপুত্র উপাধি ধারণ করেন। তিনি বৌদ্ধ ধর্মের পৃষ্ঠপােষক ছিলেন এবং মথুরায় একটি মনােরম বৌদ্ধ বিহার নির্মাণ করেন। পরবর্তী কুষাণ রাজ ছিলেন দ্বিতীয় কণিষ্ক (১৩৮-১৪৫ খ্রিঃ)। তিনি রােম সম্রাটদের অনুকরণে কাইজার উপাধি গ্রহণ করেন। এরপর সিংহাসনে বসেন প্রথম বাসুদেব (১৪৫-১৭৬ খ্রিঃ)। তিনি কুষাণ বংশের সর্বশেষ উল্লেখযােগ্য নরপতি। তার উপাধি ছিল শাহানােশাহ বাসুদেব কুষাণ। ধর্মবিশ্বাসে তিনি শৈব ছিলেন। তার অধিকাংশ মুদ্রায় শিব ও তার বাহন নন্দীর মূর্তি খােদিত আছে। তার সমস্ত লিপিই একমাত্র উত্তর প্রদেশের মথুরায় পাওয়া গেছে। তাই বলা হয় যে, তিনি একমাত্র উত্তর প্রদেশেই রাজত্ব করতেন। বাসুদেবের উত্তরাধিকারীদের সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না। তার মৃত্যুর পর ২৩০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দুজন রাজার নাম জানা গেছে — তারা হলেন তৃতীয় কণিষ্ক ও দ্বিতীয় বাসুদেব। বস্তুত বাসুদেবের মৃত্যুর পর কুষাণ সাম্রাজ্য টুকরাে টুকরাে হয়ে যায়। উত্তরপ্রদেশ ও রাজস্থানের বিভিন্ন অংশে যৌধেয়, অর্জুনায়ন, মালব, কুনিন্দ, প্রার্জুন, কাক, নাগ প্রভৃতি স্বাধীন গণরাজ্যের উৎপত্তি ঘটে। খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতকের মধ্যভাগে পারস্যে সাসানীয় বংশের অভূদ্যয় হয়। এই বংশের রাজারা ব্যাকট্রিয়া, আফগানিস্তান ও উত্তর-পশ্চিম ভারতে কুষাণ অধিকৃত কিছু অঞ্চল দখল করেন। কুষাণ রাজারা সাসানীয়নদের সামন্তবর্গে পরিণত হয়। খ্রিস্টীয় নবম শতকের শেষভাগে পাঞ্জাবের হিন্দু শাহিবংশের আক্রমণে কুষাণদের বিলুপ্তি ঘটে।

কুষাণ শাসনব্যবস্থা: কুষাণরা ভারতে একটি দক্ষ শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করে। বিভিন্ন লিপি, মুদ্রা ও সাহিত্য থেকে তাদের শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে জানা যায়। কুষাণ শাসনব্যবস্থার কয়েকটি বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়। বিদেশি ও ভারতীয় — উভয় শাসনব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য নিয়ে এই শাসনব্যবস্থা গড়ে ওঠে।
(১) পারসিক প্রদেশপাল অর্থাৎ ক্ষত্রপ বা স্যাট্রাপ, সামরিক প্রশাসক বা স্ট্রাটিগােস, জেলাশাসক বা মেরিডার্ক এবং দেশীয় মহাসেনাপতি, অমাত্য প্রভৃতি কর্মচারী নিয়ে কুষাণ শাসনব্যবস্থা গড়ে ওঠে। কুষাণ শাসনের পূর্বে যে সব অঞ্চল গ্রিক, শক, পহ্লব প্রভৃতি বিদেশিদের অধীনে ছিল, সেইসব অঞ্চলের প্রশাসকদের স্যাট্রাপ, স্ট্রাটিগােস, মেরিডার্ক প্রভৃতি নামকরণ করা হয়। অন্যদিকে ভারতের অভ্যন্তরে দেশীয় কর্মচারীদের নামকরণ হয় মহাসেনাপতি, অমাত্য প্রভৃতি।
(২) রাজতন্ত্রের মহিমা প্রচারের উদ্দেশ্যে কুষাণ রাজারা বিভিন্ন জাকজমক ও বাগাড়ম্বরপূর্ণ দেবকল্প উপাধি ধারণ করতেন এবং মৃত শাসকদের উপর দেবত্ব আরােপ করতেন। অশােকের মতাে শক্তিশালী সম্রাটের উপাধি ছিল রাজা। অপরদিকে বিম কদফিসিস ‘মহারাজ মহারাজাধিরাজ দেবপুত্র কুষাণপুত্র’ উপাধি নেন। আবার দ্বিতীয় কণিষ্ক -র উপাধি ছিল ‘মহারাজ রাজাধিরাজ দেবপুত্র কাইজার’।
(৩) শাসনকার্যের সুবিধার জন্য কুষাণ রাজারা প্রায়ই নিজ উত্তরাধিকারীকে সহযােগী বা যুগ্মশাসক হিসেবে নিয়ােগ করতেন। প্রথম কণিষ্ক বাসিষ্ককে, বাসিষ্ক হুবিষ্ককে, হুবিষ্ক প্রথমে দ্বিতীয় কণিষ্ককে এবং পরে বাসুদেবকে সহযােগী প্রশাসক নিয়ােগ করেন। এই সহযােগী প্রশাসকরা হয় রাজাদের পুত্র, নতুবা ভাই ছিলেন।
(৪) শাসনকার্যে রাজা বা সম্রাট ছিলেন সর্বেসর্বা। ধর্ম, প্রশাসন, বিচার, আইন প্রণয়ন, সামরিক ব্যবস্থা — সবদিক থেকেই তিনি ছিলেন সর্বশক্তির আধার। তার কোনও মন্ত্রীসভা বা জনপ্রতিনিধি সভা ছিল না। রাজারা সর্বশক্তিমান হলেও কিন্তু স্বৈরাচারী ছিলেন না।
(৫) কুষাণ শাসনব্যবস্থা ছিল বিকেন্দ্রীভূত। কুষাণ সাম্রাজ্য প্রদেশ জেলা, গ্রাম প্রভৃতিতে বিভক্ত ছিল। প্রদেশের শাসনভার ন্যস্ত থাকত মহাক্ষত্রণ (শাসনকর্তা) ও ক্ষত্রপ (সহকারী শাসনকর্তা) -এর উপর। গ্রামের শাসনভার ছিল গ্রামিক এর উপর।
(৬) কুষাণ শাসনব্যবস্থায় দণ্ডনায়ক ও মহাদণ্ডনায়ক নামে দুটি পদের উল্লেখ আছে। সম্ভবত এগুলি সেনাপতি বা পুলিশ প্রধানের পদ।

RELATED POSTS