প্রতিদিনের জীবনে বিজ্ঞান প্রবন্ধ রচনা

“সায়ান্স ইন এভরি ডে লাইফ” — বলে, যে কথাটি আমাদের কানে কানে সর্বদা পৌছে দেওয়া হয়, তা যে কেবল কথা নয়, সেটি যে একটি বাস্তব সত্যি, তা আমরা প্রতিদিনের জীবনযাত্রা থেকে বুঝতে পারছি। আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপের গল্প অনেকেরই জানা। আলাদিনকে বিজ্ঞান বলে যদি ভাবা যায়, তাহলে দেখা যাবে, আলাদিনের ওই আশ্চর্য প্রদীপটি। আমাদের সেবায় নিত্য জ্বলছে। এই আশ্চর্য প্রদীপটি একান্ত অনুগত, বিশ্বাসী এবং নীরবে ও বিনা প্রতিবাদে প্রতিদিন অনেক কাজ করে চলেছে। বিজ্ঞান হয়ে উঠেছে আমাদের সেবক।

প্রতিদিনের ব্যবহার্য: সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে চা তৈরি করবার জন্য আমরা যে রান্নার গ্যাসটি জ্বালাই, সেই গ্যাসটি হল এল. পি. জি.। এল. পি. জি. কথাটি সংক্ষিপ্ত। এই সংক্ষিপ্ত কথাটির বিস্তৃত নাম হল, লিকুইফয়েড পেট্রোলিয়াম গ্যাস। রান্নার কাজে যাতে এটিকে ব্যবহার করা সম্ভব হয়, তার জন্য এই বায়বীয় পদার্থটিকে সিলিণ্ডারের ভেতর ভরে রাখা হয়েছে। যাই হােক, এই জ্বালানী জ্বালিয়ে দিনের যাত্রা আরম্ভরা গেল। কিন্তু জ্বালালাম যা দিয়ে সেই লাইটারটিও কিন্তু বিজ্ঞানের মাধ্যমে পৌছেছে আমাদের হাতে। আমরা প্রতিদিন ঘরে যে আলাে জ্বালাই, এই আলাে হল, বিজলী বাতি। প্রয়ােজনে আমরা হিটার জ্বালাতে পর। এবং সেখানেও সহায়ক হবে বিদ্যুৎ। যে বিদ্যুৎ আকাশে ছিল, তাকে আমরা নামিয়ে এনেছি আমাদের প্রতিদিনের সংসারে। সে আজ দাস হিসাবে আমাদের সেবায় নিযুক্ত। আমাদের প্রতিদিনের সঙ্গী। দেড়শাে বছর আগেকার মানুষ এমন সঙ্গীটির সেবার কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারতো না।

সৌখিন ব্যবহার: আমাদের ঘরে যে ইলেকট্রিক পাখা চলছে, বিজ্ঞান আমাদের সেবা না করলে তাকে কি আমরা পেতাম। কারও কারও ঘরে রয়েছে এয়ার কুলার। বলা বাহুল্য সেটিও দিয়েছে বিজ্ঞান। রেডিও, টেলিভিশন, ফ্রিজ — এরাও আজ আমাদের সঙ্গী। রেডিওকে আমরা পেয়েছি অনেকদিন আগেই। পরে এসেছে টেলিভিশন এবং রেফ্রিজারেটার। টেলিভিশন প্রতিদিন আমাদের চোখকে, আমাদের দৃষ্টিকে নন্দিত করছে। শুধু থিয়েটার – সিনেমা নয়, জ্ঞান – বিজ্ঞানের নতুন নতুন তথ্যচিত্র সে পৌঁছে দিচ্ছে আমাদের শােবার ঘরের ভেতর। আমরা বিছানায় বসেই দেখতে পাই আফ্রিকার জঙ্গল, দক্ষিণ আমেরিকার খরস্রোতা নদী, হিংস্র পশুদের শিকার – চিত্র এবং আরও কত কিছু রেফ্রিজারেটার আমাদের সাংসারিক প্রয়ােজনে বড়ােই জরুরি। শাক – সবজি , মাছ , ডিম থেকে আরম্ভ করে ওষুধপত্র প্রভৃতি নিত্য প্রয়ােজনীয় সাংসারিক দ্রব্যকে আশ্রয় দিয়ে সতেজ রাখছে এই বস্তুটি। আমাদের রান্না করা খাবারও রেখে দেওয়া হয় এর ভেতর। তাতে বাঁচানাে হয় আমাদের বাড়তি শ্রম। সাশ্রয় হয় জ্বালানি।

জীবনের নানা ক্ষেত্রে: এবার ঘর থেকে বাইরে পা ফেলবার পর বিজ্ঞান কীভাবে আমাদের সেবায় এগিয়ে আসে, দেখা যাক। মােটরগাড়ি, মােটরসাইকেল ইত্যাদি তাে বিজ্ঞানের পরিধির ভেতর আছেই, এমন কী আমরা যে দু’চাকার সাইকেল ব্যবহার করছি, এটিও বিজ্ঞানের দান। আমরা যে পাকা রাস্তা বানিয়েছি, তার ভেতরও কাজ করছে বিজ্ঞানের কারিগরি। ট্রামবাস ইত্যাদি এসেছে বিজ্ঞানের দান হিসাবে। রেল – যােগাযােগকে আমরা বানাতে সমর্থ হয়েছি উন্নততর বিজ্ঞানের জন্য। টেলিফোন – টেলিগ্রাফ আজ আমাদের প্রতিদিনের প্রতি মুহুর্তের সঙ্গী। আমরা ঘরে বসে যে প্রতিদিন দূরদূরান্তরের চিঠিপত্র পাই, এই অসম্ভব ব্যবস্থাটি সম্ভব হত না, যদি না আমরা বিজ্ঞানের সাহায্য পেতাম। এই যে আমরা প্রতিদিন নানা-কাজে সর্বদা কলম দিয়ে লিখি, তাও সম্ভব হয়েছে বিজ্ঞানের সহায়তায়। সিনেমা, থিয়েটার, গান-বাজনা, চিত্র-স্থাপত্য-ভাস্কর্য ইত্যাদির রক্ষণাবেক্ষণ এবং সৃষ্টিতে বহু বৈজ্ঞানিক উপকরণ ব্যবহার করে চলেছি আমরা নীরবে।

আমরা বিজ্ঞানকে নিয়ে ব্যবহার করতে এমনই অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি যে, অনেক সময় আমাদের খেয়ালই থাকে না যে বিজ্ঞানকে আমরা ব্যবহার করছি। যেমন আমরা বাতাস থেকে অক্সিজেন নিয়ে বেঁচে রয়েছি, অথচ এই অক্সিজেনকে তেমন করে মনে রাখি না। কিন্তু কোনাে কারণে যদি ওই অক্সিজেনের অভাব হয়, তখনই আমরা টের পাই, ওই অভাব কী ভয়ংকর ! —বিদ্যুৎ বিভ্রাট বা লােডশেডিং হলে টের পাওয়া যায়, —বিদ্যুৎ আমাদের কতখানি সেবা করে ! সেবক বিদ্যুৎ না থাকলে পাখা চলে না, ফ্রিজ বন্ধ, পাম্প চলে না, এয়ারকুলার অকেজো হয়ে পড়ে থাকে। বাড়ির কাজের লােকের অসুখ করলেও বােধহয় এতখানি বিপর্যয় হয় না। এইভাবে বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখা আমাদের সেবা করে চলেছে।

বিজ্ঞান সর্বত্র: প্রতিদিনের গ্রামীণ জীবনেও বিজ্ঞানের দান অফুরন্ত। যে চাষি ট্রাক্টর দিয়ে চাষ করছে, সে বিজ্ঞান সর্বত্র বিজ্ঞানকেই কাজে লাগাচ্ছে। এছাড়া রয়েছে উন্নত মানের কেমিক্যাল সার। গাছের রােগ নিরাময় করার জন্য এবং শস্য ও চারাগাছের পরিচর্যার জন্য আমরা ব্যবহার করছি নানা ওষুধ। এর ভেতরেও রয়েছে বিজ্ঞানের সেবা। চিকিৎসার জন্য প্রতিদিন আমরা যে নানা ধরনের ওষুধ ব্যবহার করছি, তাতেও রয়েছে বিজ্ঞানের অবদান। বলার অপেক্ষা রাখে না, বিজ্ঞান ও কারিগরি বিদ্যা যতই উন্নততর হচ্ছে, আমাদের প্রতিদিনের জীবনে তা সেবক হয়ে এগিয়ে আসছে। ইলেকট্রনিক যন্ত্র আমাদের হাতে বসে প্রতিদিনের আয় ব্যয়ের হিসাব-নিকাশ পর্যন্ত করে দিয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিনের জীবনে বিজ্ঞান সত্যি সত্যিই আমাদের সেবক, ভৃত্য। এই ধরনের ভৃত্য সহজে পাওয়া যায় না। হাজার হাজার টাকা বেতন দিলেও এমন অনুগত সেবক কখনও মেলে না। বিজ্ঞান এখন আমাদের চারদিক ঘিরে রয়েছে।

RELATED POSTS