পাঠাগারের প্রয়োজনীয়তা রচনা

ইংরেজিতে যাকে বলে লাইব্রেরি, আমরা তাকেই বলে থাকি, পাঠাগার বা গ্রন্থাগার। শিক্ষার্থী, জ্ঞানপিপাসু, গবেষক, অধ্যাপক এবং পাঠকদের কাছে পাঠাগারের প্রয়োজন অপরিসীম। পৃথিবীর তাবৎ জ্ঞানভাণ্ডার সঞ্চয় করে রাখা হয় এই পাঠাগারে। ভাষা ও লিপির উদ্ধবের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ তার মনের ভাবকে লিখিত ভাষায় রাখতে শিখেছে। পরে এগুলি গ্রথিত হয়েছে পুঁথিতে বা গ্রন্থে। সুতরাং যুগে যুগে গ্রন্থ লিখিত হয়েছে। আজও হচ্ছে। এই সব গ্রন্থ সঞ্চিত হতে থাকে একটির পর একটি, পরে সেই সব বাড়তে বাড়তে গড়ে ওঠে পাঠাগার। যে জাতি যত সভ্য, তার পাঠাগারও তত সম্মৃধ। আর যে মানুষ যত পণ্ডিত, তার নিজস্ব গ্রন্থসংগ্রহও ততখানি বৈচিত্র্যপূর্ণ।

প্রাচীন যুগের পাঠাগার: প্রচীন যুগে কাগজ ছিল না। ছিল না ছাপাখানা। কিন্তু গ্রন্থ ছিল। তবে তা একালের মতন নয়। সেকালে লেখার কাগজের পরিবর্তে ব্যবহূত হত, ‘তালপাতা’। সেইগুলিকে পাতার পর পাতা সাজিয়ে বানানাে হত পুঁথি। যেখানে বিভিন্ন বিষয়ে পুথি সংগ্রহ করে রাখা হত, তাকে বলা হত ‘গ্রন্থকুঠি। সেকালে জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র ছিল মূলত ধর্মকেন্দ্রিক। আর এই ধর্মকেন্দ্রগুলি সাধারণত হত মন্দির, মঠ, বিহার, ও বিশ্ববিদ্যালয়। এই মঠ-মন্দিরের অধ্যাপকরা গ্রন্থাগারকে নানা নামে ডাকতেন। সে নামগুলি ছিল এইরকম : ‘ধর্মগঞ্জ’, ‘জ্ঞানভাণ্ডার’, ‘সরস্বতী ভাণ্ডার’ ইত্যাদি। দক্ষিণ ভারতের তাঞ্জরে এখনাে আছে সরস্বতী মহল। এই মহলটি সংস্কৃত গ্রন্থে সমৃদ্ধ। এই সরস্বতী মহলের আর এক নাম হল সরস্বতী ভান্ডার। জ্ঞানকে বা গ্রন্থকে আমরা হামেশাই রত্নের সঙ্গে তুলনা করে থাকি। তাই গ্রন্থাগারকে প্রাচীনকালে অনেক সময় ‘রত্নসাগর’ ও ‘রত্নদধি’ বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

কয়েকটি পুরাতন পাঠাগার: প্রাচীন যুগে জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হিসাবে যেসব জায়গা ভারতে বিখ্যাত ছিল, সেগুলি হল, তক্ষশীলা, নালন্দা, বিক্রমশীলা, মথুরা, বারাণসী ইত্যাদি। ওইসব বিদ্যাকেন্দ্রে ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছিল এক-একটি পুঁথির সংগ্রহশালা। এই সংগ্রহশালায় হাজার হাজার পুথি সঞ্চিত থাকত। অর্থাৎ আকারে ও প্রকারে এগুলি এক একটি ছিল সুবিশাল লাইব্রেরি বা পাঠাগার। তক্ষশিলা, নালন্দা ও ওদন্তপুরী পাঠাগারের এতই সমৃদ্ধি ছিল যে, তাদের নামডাক ছিল পৃথিবীব্যাপী। কিন্তু দিগ্বিজয়ী বখতিয়ার খলজি ওদন্তপুরী বিহারকে দুর্গভ্রমে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দেন। এই লেলিহান আগুনে লক্ষ লক্ষ গ্রন্থও পুড়ে ছাই হয়ে যায়। হাজার হাজার বছরের সঞ্চিত জ্ঞানভাণ্ডার এক হঠকারীর নির্বুদ্ধিতায় মুহূর্তে নষ্ট হয়ে গেল।

একালের গ্রন্থ ও পাঠাগার: মধ্যযুগের অন্ধকারে ও বলদর্পীদের মশালের আগুনে কত পাঠাগার যে এইভাবে ধ্বংস হয়েছে তার হিসাব কে রাখে ! কিন্তু তাই বলে পাঠাগার গঠনে আমরা কখনও পিছিয়ে পড়িনি এবং পাঠাগারের প্রয়ােজনীয়তার কথা কখনও ভুলিনি। কাগজ ও ছাপাখানা আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে পাঠাগারের প্রয়ােজনীয়তার কথা আরও বেশি করে উপলদ্ধি করা যাচ্ছে।

নিস্তব্ধ কল্লোল: লাইব্রেরির এই বিস্ময়কর ভূমিকাটি সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ তার অনুপম ভাষার যা লিখেছেন, তা এই প্রসঙ্গে স্মরণীয়। তিনি লিখেছেন, “মহাসমুদ্রের শত বৎসরের কল্লোল কেহ যদি এমন করিয়া বাঁধিয়া রাখিতে পারিত যে, সে ঘুমাইয়া-পড়া শিশুটির মতাে চুপ করিয়া থাকিত, তবে সেই নীরব মহাদেশের সহিত এই লাইব্রেরির তুলনা হইত। এখানে ভাষা চুপ করিয়া আছে, প্রবাহ স্থির হইয়া আছে, মানবাত্মার অমর আলোেক কালাে অক্ষরের শৃঙ্খলে কাগজের কারাগারে বাবা পড়িয়া আছে।”

পাঠাগার শহরে ও গ্রামে: একালের শিক্ষার্থী ও গবেষকদের কাছে পাঠাগারের প্রয়ােজনীয়তা কতখানি, তা এর পর আর নিশ্চয় নতুন করে ব্যাখ্যা করবার দরকার হয় না। ছােটো হলেও আমাদের প্রতিটি বিদ্যালয়ে রয়েছে ব্যবহারােপযােগী ছােট্ট এক একটি পাঠাগার। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠাগার উন্নতমানের পাঠাগার একান্তভাবেই আবশ্যক। ইদানীং সরকারি উদ্যোগে প্রতিটি জেলা-শহর ও প্রধান প্রধান নগরগুলিতে বড়াে বড়াে লাইব্রেরি তৈরি করা হচ্ছে। এদিকে প্রাচীন গ্রন্থাগার হিসাবে এশিয়াটিক সােসাইটি ও জাতীয় গ্রন্থাগার -এর তুলনা মেলা ভার। আমাদের দেশের জাতীয় গ্রন্থাগারগুলি আমাদের গর্ব। দিল্লির মহাফেজখানায় প্রচুর প্রাচীন দলিল ও কাগজপত্র রক্ষিত রয়েছে। এগুলি আমাদের দেশের ইতিহাস লেখার কাজে খুবই জরুরি।

প্রয়ােজনীয়তা: বড়াে বড়াে মনীষীদের নিজের নিজের সংগৃহীত গ্রন্থ থেকে অনেক সময় তাদের ব্যক্তিগত পাঠাগার তৈরি হয়। শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তি-সংগ্রহ থেকেই গড়ে উঠেছে একটি পাঠাগার। বিদ্যাসাগর এবং আশুতােষের ব্যক্তিগত পাঠাগার জমা রয়েছে জাতীয় গ্রন্থাগারে। এইভাবে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ অনেক ব্যক্তি সংগ্রহ নিজের ভবনে ধরে রেখেছে।

মােটকথা, লাইব্রেরি হল মানবসভ্যতার এক অত্যাশ্চর্য আবিষ্কার এমন জ্ঞানভাণ্ডার আর কোথাও নেই। পাঠকদের কাছে টানবার জন্য যে হাত বাড়িয়ে আছে। শুধু যাওয়ার অপেক্ষা।

RELATED POSTS