পরিবেশ দূষণ ও তার প্রতিকার রচনা

কোন্ মহাশিল্পী যেন একদা গড়ে দিয়েছিল বিশ্বপটকে তার অন্তরের রঙ দিয়ে, আলপনা একে। পাহাড়ি-দুর্গমতা থেকে উৎসারিত করে দিয়েছিল নদী। সে নদী কলকল্লোলে ছুটে গিয়েছিল সমতটের সবুজ প্রান্তর ছেড়ে সাগর মােহনায়। মাঝে মাঝে সাজিয়ে দিয়েছিল মুলির মতাে মহামেীন শৈলমালাকে কোনােটায় সবুজ, কোনােটায় সাদা, আবার কোনােটায় বা গৈরিক রঙ বুলিয়ে। জল-পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থানে রচনা করে দিয়েছিল বনস্পতির শীতল ছায়ায় সমাছান্ন অরণ্যের রােমাঞ্চপুরী, আর তারই ফাকে ফাকে প্রকৃতির কোল ঘেঁষে খােলা আকাশের নীচে মানুষকে ইঙ্গিত দিয়েছিল বসতি গড়ে নিতে। হয়তাে-বা দুর্বিনীত বুদ্ধিমান মানুষের প্রতি তার সতর্কবাণী ছিল — হাতে হাত ধরে চলাে এই প্রকৃতি -সখীর; এরই প্রেমে মুগ্ধ হয়ে রচনা করো ধরার ধূলিতে স্বর্গের নন্দন; লােভ কোরাে না; হয়াে না বিষয়বাসনায় মত্ত, বুদ্ধির বাহাদুরি দেখিয়ে প্রকৃতিসুন্দরীর লাবণ্যমাখা মুখখানি থেকে খসিয়ে দিও না অবগুণ্ঠন। মানুষ কী সে কথা শুনেছে।

মানব সভ্যতার অগ্রগতি ও পরিবেশ: এল বিজ্ঞান, জয় করতে চাই প্রকৃতিকে — মহানায়ক বজ্রকণ্ঠে এই কথা ঘােষণা করল বিশ্বে। সখী নয়, দাসী করতে চাই তাকে আমার আরামের হারেমে। জ্বলল আগুন, সভ্যতা গেল এগিয়ে, কিন্তু সুন্দরী প্রকৃতির মুখে লেগে গেল ছাইভস্ম। সুনির্মল বাতাসে উড়ল অগ্নিকণা, আর তার ভস্মাবশেষ। কালাে ধোঁয়া উড়ে ঢেকে দিল নীলাকাশ, সুস্বাস্থ্যকর বাতাস হল বিষাক্ত। কাটা হল বন। আবাসভূমি চাই, চাই আসবাবপত্র। বনহীন ধরণী হয়ে উঠল মরুর মতাে রুক্ষ। পবিত্র নদীজলে নিক্ষেপ করা হল কলকারখানার দূষিত পদার্থ। তীর্থবারি হয়ে উঠল পঙ্কিল জলাশয়। গ্রাম গেল, এল শহর শ্যামল প্রান্তরের পরিবর্তে পাথুরে রাস্তা, পর্ণকুটিরের স্থানে গগণচুম্বী প্রাসাদ, ধানসিঁড়ি নদীটির তীরে হারিয়ে গেল কেবল কবিকল্পনার গােপন রাজ্যে। তাই বড় দুঃখে, বড়াে ব্যথায় ইতিহাসের হারানাে পথের অনুসন্ধানে বড়ই ব্যাকুলতা, বড়ই মর্মস্পর্শী আবেদন, ‘দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর।’

বায়ু দূষণ: আমাদের প্রাকৃতিক সম্ভারের অন্যতম হল বায়ু। কিন্তু মুক্ত বায়ু আজ কোথায়? বায়ু আজ দূষণের কারগারে বন্দি। তার শরীরে দুরারােগ্য ব্যাধির ক্ষতচিহ্ন। তার স্পর্শে বিষ। তার চলনে মৃত্যুর আতঙ্ক। বিশ্বজুড়ে বায়ু আজ বিষাক্ত দূষণের শিকার। আকাশযান ও মহাকাশযানের ঘন ঘন বায়ুমণ্ডল পরিক্রমার ফলে বায়ুতে এমন অস্বাভাবিক পরিবর্তন আসছে, যার ফলে সূর্যের ক্ষতিকর বেগুণি রশ্মি বিকীর্ণ হচ্ছে ধরাপৃষ্ঠে। বাতাসে কার্বন ডাই-অক্সাইড বৃদ্ধির ফলে আবহাওয়ায় তাপমাত্রা বাড়ছে। অকালবর্ষণ, ঝড়, জল, কুয়াশা এরই ফল। ধোঁয়াশার ক্ষতিকারক ক্ষমতা মারাত্মক। মাথাধরা, শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, দীর্ঘস্থায়ী ব্রংকাইটিস, ফুসফুস-ক্যানসার এই জাতীয় দূষণের ফল।

জল দূষণ: জলের আর এক নাম জীবন। জলদূষণ আধুনিক সভ্যতার আর এক অভিশাপ। নানাভাবে দূষিত হচ্ছে সমুদ্র – নদনদী – খাল – বিলের জল। অসংখ্য কলকারখানার বিষাক্ত ক্লেদ গড়িয়ে যাচ্ছে পবিত্র প্রবাহিনীর নির্মল বক্ষে। নদীর জল তাই আজ তীর্থবারি নয়, পুষ্করিণী নয় অবগাহনক্ষেত্র, পরিবর্তে এগুলি আজ যেন পূতিগন্ধময় নরকেরদ্ধার।

শব্দ দূষণ: দূষণ শুধু বায়ুতে নয়, জলে নয়, শব্দেও। যন্ত্রদানব কত না শব্দদানবও সৃষ্টি করেছে এই বিশ্বে, তারই উপযুক্ত সন্তানরূপে। নগরে হর্নের বিকট চিৎকার, মাইকের কড়া সুর, বাজি – পটকার কানফাটা আওয়াজ, এমনকি শববাহীদের হঠাৎ হঠাৎ প্রচণ্ড উল্লাসে ফেটে পড়া তীব্র চিৎকার, সব মিলেমিশে এখানে প্রতিনিয়তই এক অপস্বর সৃষ্টির মহাযজ্ঞ চলছে। শব্দদূষণের ফলে শ্রবণ ক্ষমতার বিলােপ ঘটে। মানসিক বিপর্যয় দেখা দেয়। বাড়ে রক্তচাপ, অনিদ্রা, বাড়ে হৃৎস্পন্দনে স্নায়বিক অস্থিরতা। শব্দের ২০ থেকে ৫০ ডেসিবেল পর্যন্ত মাত্রা হল স্বাভাবিক। কলকাতায় এখন শব্দের পরিমাণ ৬০ থেকে ৬৫ ডেসিবেল, কোথাও ৮০ ডেসিবেল।

প্রতিক্রিয়া: আজ পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণী এই দায়িত্বজ্ঞানহীন পরিবেশ দূষণের শিকার। পৃথিবীর দিকে দিকে মৃত্যু, ক্ষয় ও রিক্ততার প্রকোপ যে ক্রমাগত বেড়ে চলেছে, তার মুলেও আছে পরিবেশ দূষণের অভিশাপ, বহু দুর্লভ প্রাণী, বহু দুষ্প্রাপ্য পাখি এবং বহু মূল্যবান উদ্ভিদের বংশলুপ্তি এই পরিবেশ দূষণের ক্রম পরিণাম। শুধু তাই নয় এই দূষণের প্রতিক্রিয়া মানবজীবনের ওপরও সুদুরপ্রসারী। তাই যক্ষ্মা, রক্তদুষ্টি, স্নায়ুরােগ ইত্যাদি বহু মারাত্মক দুরারােগ্য ব্যাধি আজ মানুষের জীবনকে ভরে দিয়েছে দুর্বিষহ অভিশাপে। ইনফ্লুয়েঞ্জা, শ্বাসকষ্ট বর্তমান শহরবাসীদের নিত্যসঙ্গী। ঔষধবিজ্ঞান এবং চিকিৎসাশাস্ত্র সেখানে অসহায়।

প্রতিকার: এইভাবে পরিবেশ দূষণের প্রতিক্রিয়ায় জীবকুল হয়তাে একদিন নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে এই গ্রহ থেকে। সেজন্য টনক নড়েছে রাষ্ট্রসংঘের এবং পরিবেশদূষণ প্রতিরােধ কল্পে প্রতিবছর ৫ ই জুন বিশ্বপরিবেশ দিবসরূপে পালিত হচ্ছে। আজ পরিবেশ দূষণ নয়, চাই পরিবেশের বিশুদ্ধিকরণ। আজ অরণ্যসংহার নয় — প্রতিটি মানুষকে মনােযােগী হতে হবে আনুপাতিক হারে অরণ্যসৃষ্টির জন্য। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে রকেট নিক্ষেপ ও পারমাণবিক বােমার পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ নিষিদ্ধ হওয়া চাই।

উপসংহার: বিজ্ঞানকে বাদ দিয়ে আমরা চলতে পারি না। কবির আবেগকে প্রশ্রয় দিয়েও আমরা আর ফিরে যেতে পারি না সে অরণ্যভূমিতে। এই শহরে – বন্দরে, গ্রামে – গঞ্জেই আমাদের থাকতে হবে, বিজ্ঞানের অগ্রগতিও চালাতে হবে। তবে যে বিজ্ঞানবুদ্ধি প্রধানত এই পরিবেশদূষণের জন্য দায়ী, তাকেই আজ দায়িত্ব নিতে হবে রূপসী পরিবেশের পুনর্নির্মাণের। জল, বায়ু ও শব্দকে প্রশাসনের সাহায্যে বিজ্ঞানকেই করতে হবে সম্পূর্ণ দূষণমুক্ত। পৃথিবীকে করতে হবে মানুষের বাসযােগ্য। কবির ভাষায় তাই আজ আমাদের “অন্ন চাই, প্রাণ চাই, আলাে চাই, চাই মুক্ত বায়ু; চাই বল, চাই স্বাস্থ্য, আনন্দ উল পরমায়ু; সাহস – বিস্তৃত বক্ষপটে।”

RELATED POSTS