পরবর্তী বৈদিক যুগের রাজনৈতিক অবস্থা

ঋক বৈদিক যুগের পর থেকে বুদ্ধদেবের আগমনের পূর্ববর্তী যুগ পর্যন্ত সময়কে পরবর্তী বৈদিক যুগ বলা হয়। সাম, যজু, অথর্ব, বেদ, ব্রাহ্মণ, আরণ্যক ও কয়েকটি উপনিষদ থেকে পরবর্তী বৈদিক যুগের কথা জানা যায়। এছাড়া, হস্তিনাপুরে খননকার্যের ফলে আবিষ্কৃত ১০০০-৯০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলিও আমাদের নানাভাবে সাহায্য করে। পরবর্তী বৈদিক যুগের সময়সীমা মােটামুটিভাবে ১০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত। পরবর্তী বৈদিক যুগে আর্যদের রাজনৈতিক, সমাজ, অর্থনীতি ও ধর্মীয় জীবনে সুদূরপ্রসারী ও উল্লেখযােগ্য পরিবর্তন দেখা দেয়।

পরবর্তী বৈদিক যুগে নতুন রাজ্য ও গােষ্ঠীর প্রাধান্য: পরবর্তী বৈদিক যুগে আর্যরা উত্তর-পশ্চিম ভারত থেকে পূর্ব ও দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হতে থাকে। এর ফলে আর্য সভ্যতার কেন্দ্র হিসেবে পাঞ্জাবের গুরুত্ব কমে আসে এবং গঙ্গা-যমুনা উপত্যকা বা মধ্যদেশ আর্য সভ্যতার কেন্দ্রে পরিণত হয়। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যের স্থলে পরবর্তী বৈদিক যুগে বৃহৎ বৃহৎ রাজ্যের উৎপত্তি পরিলক্ষিত হয়। ঋক বৈদিক যুগের অনেক রাজ্য ও গােষ্ঠী গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে এবং কুরু, পাঞ্চাল প্রভৃতি নতুন গােষ্ঠী উল্লেখযােগ্য হয়ে ওঠে। পুরােনাে উপজাতি গােষ্ঠীগুলি ভেঙে নতুনভাবে সংমিশ্রিত হয়ে নতুনতর আর্যগোষ্ঠী বা উপজাতি গড়ে ওঠে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় যে, ভরত ও পুরুর মিলনে কুরু উপজাতি গড়ে ওঠে। আবার তুর্বস ও কিরভির মিলনে সৃষ্টি হয় পাঞ্চাল উপজাতি। শেষে কুরু ও পাঞ্চালের সংমিশ্রণে গড়ে ওঠে কুরু-পাঞ্চাল রাজ্য। পরবর্তী বৈদিক যুগে কাশী, কোশল, বিদেহ, বৎস, মথুরা প্রভৃতি নতুন রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়।

সাম্রাজ্যবাদ: বিভিন্ন আর্থগােষ্ঠীর মধ্যে যুদ্ধ বৃদ্ধি পায় এবং বৃহৎ রাজ্যের উন্মেষ হতে থাকে। সাম্রাজ্যবাদী চিন্তাধারা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। রাজারা অশ্বমেধ, রাজসূয়, বাজপেয় প্রভৃতি যজ্ঞের অনুষ্ঠান করতে থাকেন এবং সম্রাট, বিরাট, ভোজ, সার্বভৌম, একরাট, বিশ্বজনীন প্রভৃতি উপাধি ধারণ করতে থাকেন। পরবর্তী বৈদিক যুগের আর্যদের মধ্যে রাজনৈতিক ব্যবস্থার উন্মেষ ঘটে।

রাজার ক্ষমতা: রাজার ক্ষমতা ও মর্যাদা বৃদ্ধি পায় এবং তারা দৈবত্বের দাবি করতে থাকেন। শতপদ ব্রাহ্মণে বলা আছে যে, রাজা হলেন প্রজাপতি ব্রহ্মার সাক্ষাৎ প্রতিনিধি। পরবর্তী বৈদিক যুগে রাজাকে ইন্দ্র, বরুণ, অগ্নি, যম, বায়ু প্রভৃতি দেবতার শক্তিতে বলবান বলা হত। ব্রাহ্মণ ছাড়া সবার উপর রাজার সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তিনি ইচ্ছামতাে মানুষের উপর অত্যাচার করতে পারতেন এবং শূদ্রকে হত্যা করতে পারতেন। শতপথ ব্রাহ্মণে বলা হচ্ছে যে, রাজা হলেন অভ্রান্ত ও সকল শাস্তির উর্ধ্বে।

সভা ও সমিতি: পরবর্তী বৈদিক যুগে সভা ও সমিতির অস্তিত্ব বিদ্যমান ছিল। অথর্ব বেদ ও শতপথ ব্রাহ্মণে বলা হয়েছে যে রাজা, সভা-সমিতি—এ সবেরই উৎপত্তি হয়েছে প্রজাপতির কাছ থেকে। রাজাকে বিভিন্ন কাজে সভা-সমিতির অনুমােদন নিতে হত। অথর্ব বেদে নির্বাচিত রাজতন্ত্রের উল্লেখ আছে, কিন্তু এ সত্ত্বেও এই যুগে রাজার ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং সভা-সমিতি তাদের পূর্বগৌরব হারিয়ে ফেলে।

রাজা স্বৈরাচারী ছিলেন না: ডঃ ব্যাসাম বলেন যে, পরবর্তী বৈদিক যুগে রাজার স্বৈর ক্ষমতার উপর বিশেষ কোনও নিয়ন্ত্রণ ছিল না — ব্রাহ্মণদের বিশেষ অধিকার ও জনমত রাজার ক্ষমতাকে কিছুটা নিয়ন্ত্রিত করত মাত্র। অপরদিকে ডঃ কোশাম্বি ও অপরাপর ঐতিহাসিকরা মনে করেন যে, এই যুগে রাজা স্বৈরাচারী ছিলেন না
(১) নির্বাচনের মাধ্যমে রাজন্যবর্গের নিয়োগের প্রথা পরবর্তী বৈদিক যুগেরও কিছুটা প্রচলিত ছিল।
(২) রাজপদ তখনও সম্পূর্ণ বংশানুক্রমিক না হওয়ায় জনগণের মতামতের দাম ছিল এবং জনগণ স্বৈরাচারী রাজাকে বিতাড়িত করতে পারত। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, সৃঞ্জয় উপজাতি যুগে তাদের অত্যাচারী রাজা দৃষ্টঋতুকে সিংহাসনচ্যুত করেছিল। সিংহাসন হারানাের এই ভয় রাজাকে স্বৈরাচারী হতে দিত না।
(৩) সিংহাসন লাভের পূর্বে রাজাকে অঙ্গীকার করতে হত যে, তিনি প্রজাপালন ও রাজ্যের কল্যাণে জীবন উৎসর্গ করবেন।
(৪) ব্রাহ্মণরা রাজার অভিষেক সম্পাদন করত। সুতরাং ব্রাহ্মণদের উপেক্ষা করা রাজার পক্ষে সম্ভব ছিল না।
(৫) সভা-সমিতিকে একেবারে উপেক্ষা করা রাজার পক্ষে সম্ভব ছিল না।
(৬) ধর্মন বা পবিত্র বিধান অনুসারে রাজাকে দেশশাসন করতে হত। এগুলির ব্যাখ্যা করতেন ঋষিরা। এইসব কারণে রাজার পক্ষে স্বৈরাচারী হওয়া সম্ভব ছিল না, যদিও এই যুগে রাজক্ষমতা বহুল পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছিল।

রাজকর্মচারীবৃন্দ: রাজ্যের আয়তন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শাসনকার্যে জটিলতা বৃদ্ধি পায়। ঋক বৈদিক যুগের কর্মচারীরা ছাড়াও পরবর্তী বৈদিক যুগে নতুন পদের সষ্টি হয়। সেগুলি হল— সংগ্রহিত্রী (কোষাধ্যক্ষ), ভাগদুখ (কর আদায়কারী), সূত (রাজকীয় ঘােষক), ক্ষত্রি (রাজসংসারের সরকার), অক্ষবাপ (জুয়াখেলার অধ্যক্ষ), গো-বিকর্তন (শিকারে রাজসঙ্গী) ইত্যাদি। পরবর্তী বৈদিক যুগে প্রাদেশিক শাসনব্যবস্থার সূচনা হয়। স্থপতি ছিলেন সীমান্ত অঞ্চলের ভারপ্রাপ্ত কর্মচারী। শতপতি ছিলেন একশােটি গ্রামের ভারপ্রাপ্ত। গ্রামনী ছিলেন সর্বশেষ স্তর বা গ্রামের প্রধান।

রাজস্ব: পরবর্তী বৈদিক যুগে সংগ্রহিত্রী ও ভাগদুখ নামে রাজস্ব আদায়ের জন্য দুজন কর্মচারী নিযুক্ত হয় এবং বলি ও শুল্ক বলে দুধরনের রাজস্ব আদায় করা হত। বলা বাহুল্য, এগুলি রাজস্ব ব্যবস্থার উন্নতির পরিচায়ক। ব্রাহ্মণ ও রাজপরিবারের সদস্যদের কোনও রাজস্ব দিতে হত না—জনসাধারণই তা বহন করত।

বিচারব্যবস্থা: বিচারব্যবস্থায় রাজাই ছিলেন সর্বেসর্বা—যদিও তিনি সর্বদা বিচারকার্য পরিচালনা করতেন না। বিচারের দায়িত্ব ছিল অধ্যক্ষের উপর। অনেক সময় মুষ্টিমেয় সভাসদদের দ্বারা গঠিত ক্ষুদ্র সমিতিও বিচার করত। গ্রামের ছােটোখাটো বিচার করত গ্রাম্যবাদীন (গ্রাম্যবিচারক) ও তার সভা। অনেক সময় মাধ্যমে অপরাধীকে জল ও আগুনের মধ্য দিয়ে যেতে হত। দেওয়ানি মামলা সাধারণত সালিশির মাধ্যমে মেটানো হত।