নাসিরুদ্দিন নসরত শাহ বাংলার হোসেন শাহী বংশের সুলতান

আলাউদ্দীন হােসেন শাহের মৃত্যুর পর তার পুত্র নাসিরুদ্দিন নসরত শাহ বাংলার সিংহাসনে আরােহণ করেন। মুদ্রা ও শিলালিপি থেকে জানা যায় ১৫১৯ খ্রিস্টাব্দে হোসেন শাহের মৃত্যু ও নাসিরুদ্দিন নসরত শাহ সিংহাসনে বসেন। কিন্তু নাসিরুদ্দিন নসরত শাহের ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে উৎকীর্ণ মুদ্রাও পাওয়া গেছে। এগুলি খলিফতাবাদের টাকশালে তৈরী। এর থেকে রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় সিদ্ধান্ত এসেছিলেন, নাসিরুদ্দিন নসরত শাহ পিতার জীবদ্দশায় বিদ্রোহী হয়ে দক্ষিণবঙ্গে স্বাধীনতা ঘােষণা করেছিলেন। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত যুক্তিযুক্ত বলে মনে হয় না। বাংলার সুলতানদের পুত্রেরা যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত হবার সময়েই যে নিজের নামে মুদ্রা প্রকাশের অধিকারী হতেন, তার বহু নিদর্শন পাওয়া যায়। বাবর তার আত্মকাহিনীতে লিখেছেন, যে নাসিরুদ্দিন নসরত শাহ তার পিতার মৃত্যুর পরে উত্তরাধিকার সূত্রে পিতৃসিংহাসন লাভ করেছিলেন।

বাংলার সুলতান নাসিরুদ্দিন নসরত শাহ

তবকাৎ-ই-আকবরী, মাসির-ই-রহিমী ও রিয়াজ-উস্-সালাতিনে লেখা আছে সুলতান হােসেন শাহের ১৮ জন পুত্র ছিলেন এবং নাসিরুদ্দিন নসরত শাহ তাদের মধ্যে জ্যেষ্ঠ ছিলেন। রিয়াজ-উস্-সালাতিনে লেখা আছে, অন্যান্য রাজাদের মত নসরৎ শাহ তাঁর ভাইদের বন্দী করেননি, তার বদলে তাদের পিতৃদত্ত বৃত্তি দ্বিগুণ করে দেন। একথা সত্য হলে বলতে হবে নসরৎ শাহ অত্যন্ত মহৎ প্রকৃতির লােক ছিলেন।

রিয়াজ-উস্-সালাতিনে বলা হয়েছে, তিনি ত্রিহুতের রাজাকে বন্দী করে বধ করেন। ত্রিহুত ও হাজীপুরের শেষ সীমান্ত পর্যন্ত জয় করার জন্য তিনি হােসেন শাহের জামাতা ও তাঁর অমাত্য আলাউদ্দীন ও মখদুম আলম বা শাহ আলমকে নিযুক্ত করেন। এই সময় ত্রিহুত বা মিথিলায় কামেশ্বর বংশীয় রাজারা রাজত্ব করতেন। তাদের মধ্যে শেষ যে রাজার নাম জানা যায় — তিনি ভৈরব সিংহের পৌত্র ও রামভদ্র সিংহের পুত্র লক্ষ্মীনাথ বা কংসনারায়ণ। এর রাজত্বকাল নসরৎ শাহের সমসাময়িক। সুতরাং নসরৎ শাহই কংসনারায়ণকে বধ করে এই বংশ লােপ করেছিলেন বলে মনে করা হয়। নসরৎ শাহের ত্রিহুত অধিকারের একটি প্রত্যক্ষ প্রমাণও পাওয়া গিয়েছে। ত্রিহুতের বেগুসরাইয়ে নসরৎ শাহ একট মসজিদ নির্মাণ করিয়েছিলেন, তার শিলালিপি পাওয়া গিয়েছে, মসজিদটিকে নদী গ্রাস করেছে। তাছাড়া ত্রিহুতে নসরৎ শাহ, তার পিতা হােসেন শাহ ও হাবশী সুলতান মুজঃফর শাহের মুদ্রা আবিষ্কৃত হয়েছে।

১৫২৬ সালে দিল্লির সুলতান ইব্রাহিম লোদিকে পরাজিত করে কাবুলের অধিপতি বাবর দিল্লির সিংহাসনে বসেন। এই সময় উত্তর ভারত থেকে বিতাড়িত আফগানরা পূর্ব ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করেন। জৌনপুরের লোহানি বংশীয় বাহর খাঁ লোহানি, বিহারের শের খাঁ, লোদী বংশের মামুদ এবং বাংলার সুলতান নাসিরুদ্দিন নসরত শাহ মোগল বিরোধী শক্তিজোট গঠন করে। ১৫২৯ সালে বাবরের সঙ্গে নাসিরুদ্দিন নসরত শাহের সংঘর্ষ হয়, এবং পরাজিত হয়ে বাবরের আনুগত্য মেনে নেন।

অহােম বুরজী থেকে জানা যায় যে নসরৎ শাহ তার রাজত্বের শেষ বছরে আসাম আক্রমণ করেছিলেন। ১৫৩২ খ্রীষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে তুরবক নামে বাংলার একজন মুসলমান সেনাপতি ৩০টি হাতী , ১০০০টি ঘােড়া এবং বহু কামান নিয়ে অহােম রাজ্য আক্রমণ করেন। তেমেনি দুর্গ বিনা বাধায় জয় করার পরে মুসলমানরা অহােম রাজ্যের দুর্ভেদ্য ঘাঁটি সিঙ্গরির সামনে এসে তাঁবু ফেলেন। সিঙ্গরির ঘাঁটি রক্ষা করছিলেন বর পাত্র গােহাইন। অহােম রাজ তাঁর পুত্র সুক্লেনকে একদল শক্তিশালী সৈন্য দিয়ে সিঙ্গরি রক্ষা করবার জন্য পাঠান। অল্পকালের মধ্যেই দুই পক্ষের খণ্ডযুদ্ধ শুরু হয়ে গেল এবং কিছু দিন ধরে তা চলতে থাকে। সুক্লেন ব্রহ্মপুত্র নদ পার হয়ে মুসলমানদের আক্রমণ করলেন। তুমুল যুদ্ধের ফলে মুসলমানরা প্রথমে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েন, কিন্তু অবশেষে তারা অসমীয়াদের পরাজিত করতে সমর্থ হন। আটজন অসমীয়া সেনাধ্যক্ষ নিহত হয়, বহু লােক জলে ডুবে মারা যায়, রাজপুত্র সুক্লেন আহত হন। অবশিষ্ট অসমীয়া সৈন্যবাহিনী সালা নামক জায়গায় পালিয়ে যায়। এরই মধ্য ১৫৩২ খ্রিস্টাব্দে এক আততায়ীর হাতে নাসিরউদ্দিন নুসরাত শাহ নিহত হন।

নসরত শাহের রাজ্যের আয়তন তার পিতার রাজ্যের তুলনায় কম ছিল না, হােসেন শাহের রাজ্যের পশ্চিম সীমারেখা বর্তমান বিহার রাজ্যের পশ্চিম সীমারেখাকে কোথাও অতিক্রম করেনি বলে মনে হয়। কিন্তু নসরত শাহে রাজ্যের মধ্যে বর্তমান উত্তর প্রদেশের অন্তর্গত কোন কোন স্থানও অন্তভুক্ত ছিল। উত্তর প্রদেশের খরিদ বা সিকন্দরপুরে নসরত শাহের শিলালিপি পাওয়া গিয়েছে এবং রিয়াজ উস সালাতিন এর মতে নসরৎ শাহ উত্তর প্রদেশের ভরাইচে কুৎবা এর অধীনে এক বিরাট সৈন্যবাহিনী পাঠিয়েছিলেন। সমসাময়িক পর্তুগীজ বিবরণ থেকে জানা যায় যে, চকরিয়া অঞ্চল এবং চট্টগ্রাম বন্দর নসরত শাহের রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল।

নসরত শাহ ধর্মপ্রাণ মুসলমান ছিলেন। গৌড়ে তিনি অনেকগুলি মসজিদ নির্মাণ করিয়েছিলেন। গৌড়ে কদম রসূল মসজিদ নামে যে বিখ্যাত মসজিদটি আছে, সেটি তিনিই নির্মাণ করিয়েছিলেন বলে গােলাম হােসেন থেকে শুরু করে আবিদ আলী পর্যন্ত সমস্ত ঐতিহাসিক লিখেছেন। এই মসজিদেরই প্রকোষ্ঠে একটি কালাে কারুকার্যখচিত মর্মর-বেদীর উপরে হজরত মুহম্মদের পদচিহ্ন উৎকীর্ণ একটি পাথর ছিল। এই প্রকোষ্ঠের দরজার মাথায় একটি শিলালিপিতে লেখা আছে যে সুলতান নাসিরুদ্দীন নসরত শাহ ৯৩৭ হিজরায় এই পবিত্র মঞ্চ এবং এর পাথর যার উপরে নবীর পদচিহ্ন আছে, তা উৎকীর্ণ করিয়েছিলেন। সম্ভবত এর থেকেই ঐতিহাসিকেরা মনে করেছেন যে নসরৎ শাহই মসজিদটির নির্মাতা। কিন্তু এই মসজিদটির ফটকের উপরে একটি শিলালিপি ছিল, তাতে লেখা ছিল যে সুলতান আলাউদ্দীন হােসেন শাহের রাজত্বকালে ১৯০৯ হিজরার ২২শে মহরম তারিখে এই ফটক নির্মিত হয়েছিল। এখনও মসজিদের প্রবেশপথের বা পাশের ভিতরের দিকে একটি শিলালিপি রয়েছে, তাতে লেখা আছে যে সুলতান শামসুদ্দীন যুমুফ শাহের রাজত্বকালে ১৮ই রমজান তারিখে মির্শাদ খান এই মসজিদ তৈরী করিয়েছিলেন। নসরৎ শাহ কেবলমাত্র হজরত মুহম্মদের পদচিহ্ন সংবলিত পাথরটি ও যে মঞ্চের উপরে সেটি রক্ষিত ছিল, সেইটি স্থাপন করেছিলেন এবং তার সময় থেকেই এই মসজিদটি কদম রসূল নামে পরিচিত হয়। মসজিদটির আদি নির্মাতা তিনি নন।

নাসিরউদ্দিন নুসরাত শাহ শিক্ষা, সাহিত্য ও শিল্পের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। নসরত শাহ গৌড়ের বিখ্যাত বার দুয়ারী মসজিদ বা বড় সােনা মসজিদ নির্মাণ করেন। এটির নির্মাণ ১৫৩০ খ্ৰীষ্টাব্দে সমাপ্ত হয়। শ্রীকর নন্দী, কবিন্দ্র পরমেশ্বর, কবিশেখর প্রমুখ কবি সাহিত্যিকরা তার পৃষ্ঠপোষকতা অর্জন করেন। নাসিরুদ্দিন নসরত শাহ এর একজন হিন্দু সেনাদক্ষ হলেন বসন্ত রাও।

নসরত শাহের যে সব মুদ্রা এ পর্যন্ত পাওয়া গিয়েছে, সেগুলি এই সমস্ত জায়গার টাকশাল থেকে উৎকীর্ণ হয়েছিল, নসরতাবাদ, ফতেহাবাদ (ফরিদপুর), হােসেনাবাদ, খলিফতাবাদ (দক্ষিণ যশােহর), মুহম্মদাবাদ (উত্তর যশােহর)। এই সমস্ত জায়গায় নসরত শাহের শিলালিপি আবিষ্কৃত হয়েছে – গৌড়, সােনারগাঁও (ঢাকা), মঙ্গলকোট (বর্ধমান), মৌলানাতলী (মালদহ), বাঘা (রাজশাহী), আশরফপুর (ঢাকা), নবগ্রাম (পাটন), সিকন্দরপুর (খরিদ, উত্তর প্রদেশ), দেওতলা (মালদহ), মালদহ, মুর্শিদাবাদ, সাতগাঁও (হুগলী), সন্তোষপুর (হুগলী), বেগুসরাই (ত্রিহুত)। এর থেকে নসরত শাহের রাজ্যের আয়তন সম্বন্ধে বেশ সুস্পষ্ট ধারণা করা যায়।