গৌড়াধিপতি স্বাধীন রাজা শশাঙ্ক

ষষ্ঠ শতকের প্রথমভাগে গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের কালে বাংলাদেশে একাধিক স্বাধীন রাজ্যের উৎপত্তি ঘটে। খ্রিস্টীয় সপ্তম শতকের প্রথমভাগে এইসব রাজ্যগুলির মধ্যে গৌড় রাজ্য সর্বাধিক খ্যাতি ও প্রভাব অর্জন করে। গৌড় রাজ্যের এই খ্যাতি ও প্রতিষ্ঠার মূলে ছিল গৌড়াধিপতি শশাঙ্কের (ইংরেজি: Shashanka) নেতৃত্ব। শশাঙ্ক-র বংশ বা বাল্যজীবন সম্বন্ধে সঠিক কিছুই জানা যায় না। কেউ কেউ মতপ্রকাশ করেছেন যে, শশাঙ্কের অপর নাম নরেন্দ্রগুপ্ত এবং তিনি গুপ্ত রাজবংশে জন্ম গ্রহণ করেন। কিন্তু এই মতটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে মনে হয়। প্রাচীন রোহিতাশ্ব (রােটাসগড়) গিরিগাত্রে খোদিত একটি শিলালিপিতে শ্রীমহাসামন্ত শশাঙ্ক এই পদটি পাওয়া যায়। যদি এই শশাঙ্ক ও গৌড়রাজ শশাঙ্ককে অভিন্ন বলে গ্রহণ করা হয়, তা হলে স্বীকার করতে হয় যে শশাঙ্ক প্রথমে একজন মহাসামন্ত মাত্র ছিলেন। আবার কেউ কেউ অনুমান করেন যে শশাঙ্ক মৌখরি রাজ্যের অধীনস্থ সামন্তরাজা ছিলেন।

শশাঙ্ক: গৌড়াধিপতি স্বাধীন রাজা শশাঙ্ক

শশাঙ্কের আদি পরিচয় ও রাজ্যজয়: ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষভাগে গুপ্তরাজ মহাসেনগুপ্ত মগধ ও গৌডের অধিপতি ছিলেন। সুতরাং শশাঙ্ক এই মহাসেনগুপ্তের অধীনে মহাসামন্ত ছিলেন এই মতই অধিকতর যুক্তিযুক্ত বলে মনে হয়। মহাসেনগুপ্তের মৃত্যুর পর ৬০৬ খ্রিস্টাব্দের পূৰ্বেই শশাঙ্ক গৌড়ে একটি স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই যুগে গৌড় বলতে উত্তর বাংলা ও পশ্চিম বাংলাকে বােঝাত। শশাঙ্কের রাজধানী ছিল কর্ণসুবর্ণ খুব সম্ভবত মুর্শিদাবাদ জেলায় বহরমপুরের ছয় মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে রাঙ্গামাটি নামক স্থানে অবস্থিত ছিল। ড: রমেশচন্দ্র মজুমদার বলেন, বাঙালি রাজগণের মধ্যে শশাঙ্কই প্রথম সার্বভৌম নরপতি। শশাঙ্ক দক্ষিণে দণ্ডভুক্তি (মেদিনীপুর জেলা), উৎকল (বালেশ্বর অঞ্চল) ও কঙ্গোদ (ওড়িশ্যার গঞ্জাম জেলা) জয় করেন। উৎকল ও দণ্ডভুক্তি তার রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। শৈলােদ্ভব বংশীয় রাজগণ তাহার অধীনস্থ সামন্তরূপে কঙ্গোদ শাসন করতেন। পশ্চিমে মগধ রাজ্যও শশাঙ্ক জয় করেন।

শশাঙ্ক বনাম পুষ্যভূতি বংশের সঙ্গে দ্বন্দ্ব: শশাঙ্ক বাংলা, বিহার এবং উড়িষ্যার কিছু অংশ জয় করার পর শশাঙ্ক গৌড়ের শত্রু মৌখরি-রাজ গ্রহবৰ্মন এর বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেন। মৌখরিরাজ গ্রহবৰ্মন পরাক্রান্ত থানেশ্বর-রাজ পুষ্যভূতি বংশের প্রভাকরবর্ধনের কন্যা রাজ্যশ্রীকে বিবাহ করেছিলেন। কামরূপরাজ ভাস্করবর্মন শশাঙ্কের ভয়ে থানেশ্বর রাজের সঙ্গে মিত্রতা স্থাপন করেন। শশাঙ্ক এই সম্মিলিত শক্তির বিরুদ্ধে সাহায্যের জন্য মালবরাজ দেবগুপ্তের সঙ্গে সন্ধি সূত্রে আবদ্ধ হন। দেবগুপ্ত ও শশাঙ্ক যৌথভাবে কনৌজ আক্রমণ করেন। গ্রহবর্মন পরাজিত ও নিহত হন এবং রাজ্যশ্রীকে বন্দী করা হয়। থানেশ্বররাজ প্রভাকরবর্ধনের মৃত্যুর পর থানেশ্বরের সিংহাসনে রাজ্যবর্ধন আরোহণ করে, দেবগুপ্তের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেন। এই যুদ্ধে দেবগুপ্ত পরাজিত ও নিহত হন। কিন্তু বিপরীত দিকে রাজ্যবর্ধন আবার শশাঙ্কের হাতে নিহত হন। শশাঙ্ক কর্তৃক রাজ্যবর্ধনের হত্যার কথা আমরা তিনটি সূত্রে জানিতে পারি। হর্ষবর্ধনের সভাকবি বাণভট্টের হর্ষচরিত গ্রন্থ, চীনদেশীয় পরিব্রাজক হিউয়েন সাং-এর কাহিনী, এবং হর্ষবর্ধনের শিলালিপি থেকে।

বাণভট্ট ও হিউয়েন সাং বলেন যে, শশাঙ্ক বিশ্বাসঘাতকতা করে রাজ্যবর্ধনকে হত্যা করেন। ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদার-এর মতে, শশাঙ্ক রাজ্যবর্ধনকে ন্যায় যুদ্ধে পরাজিত করেন। এ ছাড়াও তিনি বলেন যে, বাণভট্ট ও হিউয়েন সাঙ এর বিবরণে নানা অসঙ্গতি আছে। ডঃ রাধাগােবিন্দ বসাক, ডঃ ডি. সি. গাঙ্গুলী এবং অধ্যাপিকা দেবাহুতি অবশ্য শশাঙ্কের বিশ্বাসঘাতকতার বিষয়টি মেনে নিয়েছেন। তবে সমকালীন রাজনৈতিক মানসিকতার প্রেক্ষাপটে শশাঙ্কের কাজ বিশ্বাসঘাতকতামূলক হলেও অনৈতিক ছিল না।

বাণভট্ট বলেন যে রাজ্যবর্ধনের হত্যার সংবাদ শুনে হর্ষবর্ধন শপথ নেন, যদি নির্দিষ্ট দিনের মধ্যে তিনি গৌড়শূন্য করতে না পারলে তিনি অগ্নিতে ঝাপ দিয়ে প্রাণত্যাগ করবেন। রাজ্যবর্ধনের মৃত্যুর পর তার কনিষ্ঠ ভ্রাতা হর্ষবর্ধন থানেশ্বরের সিংহাসনে বসেন এবং শশাঙ্কের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেন। বৌদ্ধগ্রন্থ আর্যমঞ্জুশ্রীমূলকল্প বলা হয়েছে যে, হর্ষবর্ধন শশাঙ্ককে পরাজিত করেন। এ মত গ্রহণযােগ্য নয়। শশাঙ্ক ও হর্ষবর্ধনের মধ্যে কোনও যুদ্ধ সম্পর্কে বাণভট্ট ও হিউয়েন সাঙ সম্পূর্ণ নীরব। এছাড়া আর্যমঞ্জুশ্রীমূলকল্প একটি বৌদ্ধগ্রন্থ এবং তা অনেক পরবর্তীলের রচনা করা হয়।

শশাঙ্কের মৃত্যু: আর্যমঞ্জুশ্রীমূলকল্পে বলা হয়েছে শশাঙ্ক ১৭ বছর রাজত্ব করেন। কিন্তু এটা সত্য নয়। হিউয়েন সাং বলেন শশাঙ্ক ৬০৬ অব্দের পূর্বেই রাজসিংহাসনে আরােহণ করেন এবং ৬৩৭ অব্দের অনতিকাল পূর্বে শশাঙ্ক মৃত্যু হয়। শশাঙ্কের যে তিনটি লিপি পাওয়া যায় তার একটির তারিখ ৬১৯ অব্দ। মৃত্যুকাল পর্যন্ত শশাঙ্ক গৌড়, মগধ, দগুভূক্তি, উৎকল ও কঙ্গোদের অধিপতি ছিলেন।

শশাঙ্কের ধর্ম: শশাঙ্ক শিবের উপাসক ছিলেন। বাণভট্ট, হিউয়েন সাং ও বিভিন্ন বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থে তাকে বৌদ্ধধর্ম বিদ্বেষী বলা হয়েছে। বাণভট্ট শশাঙ্ককে গৌড়াধম ও গৌড়ভুজঙ্গ বলে অভিহিত করেছেন। হিউয়েন সাং বলেন যে, শশাঙ্ক বুদ্ধ গয়ার পবিত্র বােধিবৃক্ষ ছেদন করেন এবং বৃক্ষের শিকড় উৎপাটন করেন। তিনি পাটলিপুত্রে বুদ্ধের চরণচিহ্ন অঙ্কিত প্রস্তরখণ্ড বিনষ্ট করেন এবং কুশীনগর বিহার থেকে বৌদ্ধদের বিতাড়িত করেন। তার মতে এইসব অত্যাচারের পাপেই নাকি শশাঙ্ক দুরারােগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। ডঃ নীহাররঞ্জন রায় ও রাধাগােবিন্দ বসাক শশাঙ্ক বিরােধীদের সঙ্গে সহমত পােষণ করলেও ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদার ও ডঃ রমাপ্রসাদ চন্দ্র উপরােক্ত মতামতগুলি গ্রহণ করতে রাজি নন। তাদের মতে হর্ষের অনুগত হিউয়েন সাঙ ও বাণভট্ট শশাঙ্ক বিদ্বেষী ছিলেন। হিউয়েন সাঙের রচনা থেকে জানা যায় যে, শশাঙ্কের রাজত্বকালে বাংলাদেশে বৌদ্ধ ধর্মের যথেষ্ট প্রসার ঘটেছিল, রাজধানী কর্ণসুবর্ণে তাদের যথেষ্ট প্রতিপত্তি ছিল এবং তিনি নিজেই তাম্রলিপ্ত, কর্ণসুবর্ণ প্রভৃতি স্থানে বহু বৌদ্ধ স্তুপ দেখেছিলেন।

শশাঙ্কের কৃতিত্ব: বাংলার ইতিহাসে শশাঙ্ক একটি বিশিষ্ট স্থানের অধিকারী। সর্বভারতীয় রাজনীতিক্ষেত্রে তিনিই প্রথম বাংলাকে এক বিশিষ্ট মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেন। বাঙালি রাজনীতিবিদদের মধ্যে তিনিই প্রথম আর্যাবর্তে বাঙালির সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেন এবং তা আংশিকভাবে কার্যে পরিণত করেন। চতুর কুটকৌশলী শশাঙ্ক প্রবল শক্তিশালী হর্ষবর্ধনের সকল চেষ্টা ব্যর্থ করে বঙ্গ, বিহার ও উড়িষ্যায় আধিপত্য বজায় রাখেন। তার রাজ্যজয় দ্বারা তিনি যে নীতির পত্তন করেন, তা অনুসরণ করে পরবর্তীকালে পালরাজারা এক বিশাল সাম্রাজ্য স্থাপন করেন।