গুপ্ত যুগের সমাজ ব্যবস্থা কেমন ছিল?

গুপ্ত যুগের সমাজ ব্যবস্থা সম্পর্কে জানার জন্য সবচেয়ে মূল্যবান উপাদান হল স্মৃতিশাস্ত্র। এগুলির মধ্যে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হল যাজ্ঞবল্ক্য-স্মৃতি, নারদ-স্মৃতি, বৃহস্পতি-স্মৃতি ও কাত্যায়ন-স্মৃতি। স্মৃতিশাস্ত্র গুলিতে আদর্শ ব্রাহ্মণ্য দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশিত হলেও বাস্তবের সঙ্গে তার কোনও মিল ছিল না, বা বাস্তবে সেগুলি মেনে চলা সম্ভব ছিল না। সমকালীন সংস্কৃত নাটক এবং গদ্য ও পদ্য রচনা এবং ফা-হিয়েন ও হিউয়েন সাঙ-এর বিবরণী থেকেও নানা তথ্যাদি পাওয়া যায়।

গুপ্ত যুগের চতুবর্ণ ব্যবস্থা : মৌর্য ও মৌর্যোত্তর যুগে বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের সংস্কার আন্দোলনের প্রতিক্রিয়া হিসেবে গুপ্তযুগে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রতি-সংস্কার আন্দোলন শুরু হয়। এর সুফল হিসেবে সমাজে ব্রাহ্মণদের প্রাধান্য এবং বর্ণব্যবস্থা সুদৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ শুরু হয়। এই যুগে জন্মগত বর্ণব্যবস্থা এবং ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র ভেদাভেদ জোরদার হয়ে ওঠে। বরাহমিহির তার বৃহৎসংহিতায় শহর বা গ্রামে চার বর্ণের জন্য পৃথক পৃথক স্থানে বসবাসের নির্দেশ দিয়েছেন। বর্ণপ্রথা ছিল বংশানুক্রমিক এবং মনুসংহিতায় প্রত্যেক বর্ণের নিজস্ব বৃত্তি বা পেশার উল্লেখ করা হয়েছে। বাস্তবে কিন্তু স্মৃতিশাস্ত্রের এইসব বিধান মেনে চলা হত না বা এইসব বিধান লঙ্ঘিত হত। ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয় নিম্নতর বর্ণের এবং বৈশ্য ও শূদ্র প্রায়ই উচ্চতর বর্ণের পেশা গ্রহণ করত।
(১) খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতকের একটি লিপিতে দু’জন ক্ষত্রিয় বণিকের উল্লেখ পাওয়া যায় — যদিও বাণিজ্য ক্ষত্রিয়ের জন্মগত পেশা নয়।
(২) এই একই আমলের অপর একটি লিপি থেকে জানা যায় যে, পশ্চিম ভারতের একটি রেশম ব্যবসায়ী গােষ্ঠী নিজেদের বৃত্তি ত্যাগ করে শাস্ত্রচর্চা ও যুদ্ধবিদ্যাকে জীবিকা হিসেবে গ্রহণ করে।
(৩) ব্রাহ্মণ ময়ূর শর্মন ক্ষত্রিয়ের যুদ্ধবৃত্তি গ্রহণ করে শেষ পর্যন্ত কদম্ব রাজবংশের প্রতিষ্ঠা করেন।
(৪) গুপ্তদের অধীনে কর্মরত ব্রাহ্মণ সামন্ত মাতৃবিষ্ণু পরবর্তীকালে এক রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেন।
(৫) গুপ্ত সম্রাটরা বৈশ্য ছিলেন।
(৬) হিউয়েন এর বিবরণ থেকে জানা যায় যে উজ্জয়িনী, জিঝোতি ও মহেশ্বরপুরের রাজারা ব্রাহ্মণ ছিলেন।
(৭) কেবলমাত্র রাজপদই নয় — রাহ্মণদের অনেকেই হীনবৃত্তি গ্রহণ করেন। এই যুগে হলকর্ষণরত এবং দস্যু ও কিরাতের বৃত্তি গ্রহণকারী ব্ ব্রাহ্মণেরও দেখা মিলেছে।

ব্রাহ্মণ, বৈশ্য ও শুদ্রের অবস্থা : গুপ্ত যুগের সমাজে ব্রাহ্মণের স্থান ছিল সবার উপরে — তাদের বলা হত বর্ণশ্রেষ্ঠ। কাত্যায়ন-স্মৃতি অনুসারে কোনও অপরাধের জন্য ব্রাহ্মণের সর্বাধিক শাস্তি ছিল নির্বাসন। সম্পত্তি বাজেয়াপ্তকরণ বা মৃত্যুদণ্ড ব্রাহ্মণদের ক্ষেত্রে প্রযােজ্য ছিল না। গুপ্ত ও বাকটিক-বংশীয় রাজারা ব্রাহ্মণদের নিষ্কর ভূমি দান করতেন। এর ফলে ব্রাহ্মণদের মর্যাদা ও প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পায়। গুপ্ত যুগে বৈশ্যদের অবস্থার অবনতি ঘটে, কিন্তু শূদ্রদের মর্যাদা উন্নততর হয়। দরিদ্র বৈশ্য ও শুদ্রের মধ্যে বিশেষ কোনও পার্থক্য ছিল না। পূর্বে শূদ্ররা গৃহভৃত্য, ক্রীতদাস ও কৃষিশ্রমিক হিসেবে পরিগণিত হতেন, এবং তাদের কাজ ছিল উচ্চ তিন বর্ণের সেবা করা। এই যুগে শুদ্ররা কৃষিজীবী মানুষ হিসেবে বিবেচিত হতে থাকেন। তাদের রামায়ণ-মহাভারত ও পুরাণ পাঠের অধিকার মেনে নেওয়া হয় এবং তারা নতুন দেবতা কৃষ্ণের পূজার অধিকারী হন।

অনুলোম ও প্রতিলোম বিবাহ : গুপ্ত যুগের সমাজ ব্যবস্থায় নিজ বর্ণের মধ্যে বিবাহই ছিল সাধারণ নিয়ম। এ সত্ত্বেও স্মৃতিশাস্ত্রের বিধান লঙ্ঘন করে এই যুগে অনুলােম ও প্রতিলােম বিবাহ চলতে থাকে। বাকটিক-রাজ ব্রাহ্মণ রুদ্রসেনের সঙ্গে গুপ্ত সম্রাট বৈশ্য দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের কন্যা প্রভাবতী দেবীর বিবাহ হয়। বাকাটক-রাজ দ্বিতীয় দেবসেনের মন্ত্রীর পূর্বপুরুষ ব্রাহ্মণ সােমের পত্নী ক্ষত্রিয় ছিলেন। কদম্ব বংশের ব্রাহ্মণ-রাজা কাকুস্থবর্মণ তার কন্যাদের বিবাহ দেন বৈশ্য গুপ্ত রাজবংশে। থানেশ্বরের বৈশ্য-রাজা হর্ষবর্ধনের কন্যার বিবাহ হয় বলভীর ক্ষত্রিয় রাজবংশে। ইক্ষাকুবংশীয় ব্রাহ্মণ রাজাদের সঙ্গে উজ্জয়িনীর শক রাজকন্যাদের বিবাহ হয়। হর্ষের সভাকবি ব্রাহ্মণ বাণভট্টের পিতা শূদ্র নারীকে বিবাহ করেন। গুপ্ত যুগের বিখ্যাত নাটক ‘মৃচ্ছকটিক’-এ ব্রাহ্মণ চারুদত্ত কর্তৃক গণিকা বসন্তসেনাকে এবং ব্রাহ্মণ শর্বলিক কর্তক গণিকার দাসী মনিকা-কে বিবাহের উল্লেখ পাওয়া যায়। ‘দশকুমার চরিত’ থেকে ক্ষত্রিয় রাজকুমার কর্তৃক চম্পা নগরীর গণিকা কন্যাকে বিবাহের কথা জানা যায়। ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয় অর্থাৎ সমাজের উচ্চতর শ্রেণির এইসব দৃষ্টান্ত নিম্নতর বর্ণ ও শ্রেণির মানুষের পক্ষে অনুসরণ করা স্বাভাবিক ছিল।

গুপ্ত যুগের মিশ্ৰজাতি ও অস্পৃশ্য : অসবর্ণ বিবাহের ফলে সমাজে সংকর বা মিশ্রজাতির সৃষ্টি হয়, যার সূচনা গুপ্ত যুগের অনেক আগেই হয়েছিল। স্মৃতিশাস্ত্রের বিধান সত্ত্বেও এরা একেবারে ব্রাত্য ছিল। মিশ্রজাতির মধ্যে চণ্ডালদের অবস্থা ছিল শােচনীয়। উচ্চবর্ণের নারী ও নিম্নবর্গের পুরুষের বিবাহজাত সন্তান চণ্ডাল শ্রেণিভুক্ত হত। মনু, যাজ্ঞবল্ক্য, বৃহস্পতি, পরাশর, দেবল প্রমুখ স্মৃতিকারেরা চণ্ডালদের অস্পৃশ্য ও অশুচি বলে অভিহিত করেছেন। তারা গ্রাম ও শহরের বাইরে বাস করত। কেবলমাত্র চণ্ডালরাই নই — হিউয়েন সাঙ এবং ইৎ সিং-এর রচনা থেকে জানা যায় যে জল্লাদ, কসাই, ঝাড়ুদার প্রভৃতি শ্রেণির মানুষরাও লােকালয়ের বাইরে অন্যের স্পর্শ বাঁচিয়ে বাস করত। শবর, পুলিন্দ, কিরাত প্রভৃতি আদিম উপজাতির মানুষ আর্য সমাজের অন্তর্ভুক্ত হয়ে অস্পৃশ্য বলে পরিগণিত হত। এদের স্থান ছিল চণ্ডালদেরও নীচে।

গুপ্ত যুগের বিনোদন : ধনী এবং প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা শহরে বসবাস করত। ব্যাৎসায়নের কামসূত্র, শুদ্রকের মৃচ্ছকটিক থেকে নাগরিকদের বিলাসবহুল জীবনযাত্রার কথা জানা যায়। কাব্য, সাহিত্য, নাটক ও চারুকলার চর্চা, নৃত্য-গীত, দাবা, পাশা ও জুয়া খেলা, কুস্তি, রথের দৌড় প্রভৃতি ছিল তাদের বিনােদন বা আমােদ-প্রমােদের উপায়।

গুপ্ত যুগে নৈতিকতা, দাসপ্রথা ও নারীর মর্যাদা : গুপ্ত যুগের সমাজ ব্যবস্থায় নৈতিকতার মান বিশেষ উঁচু ছিল না। সমাজে গণিকার স্থান ছিল এবং উচ্চশ্রেণির মনােরঞ্জনের জন্য তাদের নানা বিদ্যা ও কলা-কৌশল আয়ত্ত করতে হত। দাসপ্রথাও এ যুগে প্রচলিত ছিল। এই যুগের সাহিত্যে নারীর গুণগান করা হলেও বাস্তবে নারীর অবস্থা এতটা উন্নত ছিল না। নারীরা বিদ্যাচর্চা, নৃত্য-গীত প্রভৃতির চর্চা করতেন ঠিকই, কিন্তু এই যুগে আবার বাল্যবিবাহ, সতীদাহ প্রভৃতি প্রচলিত হয়।

গুপ্ত যুগের শিক্ষাব্যবস্থা : গুপ্তযুগে ব্রাহ্মণ্য ও বৌদ্ধ শিক্ষার প্রসার ঘটে। ধনবান ব্যক্তি ও রাজন্যবর্গ বিভিন্ন মন্দিরে যে সব গ্রাম দান করতেন, সেখানে গড়ে ওঠে ‘অগ্রহার গ্রাম’। কালক্রমে এইসব স্থানে মন্দিরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে অবৈতনিক বিদ্যায়তন। সাধারণত মানুষ এইসব প্রতিষ্ঠানেই শিক্ষাগ্রহণ করত। দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের আমলে আগত চিনা পরিব্রাজক ফা-হিয়েন কান্যকুব্জ, শ্রাবস্তী, কুশীনগর, বৈশালী, পাটলিপুত্র, গয়া, রাজগৃহ, সারনাথ প্রভৃতি স্থানে বেশ কিছু বৌদ্ধ শিক্ষাকেন্দ্র লক্ষ করেন। কাঞ্চি, কাশী, নাসিক ছিল এই যুগের বিখ্যাত উচ্চশিক্ষা কেন্দ্র। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতি ছিল বিশ্ববিখ্যাত। দেশ-বিদেশের ছাত্ররা এখানে সমবেত হতেন। বৌদ্ধশাস্ত্র ছাড়াও এখানে ব্যাকরণ, ছন্দ, অলঙ্কার, তর্কশাস্ত্র, দর্শন, চিকিৎসাশাস্ত্র প্রভৃতি বহু বিষয়ের শিক্ষা দেওয়া হত। নিগম বা বাণিজ্য সংঘগুলিতে ধাতুবিদ্যা, পাথর খােদাই, সােনার অলঙ্কার তৈরি, হাতির দাঁতের কাজ, কাঠের কাজ শেখানাে হত।

RELATED POSTS