খিলাফত অর্থ কি এবং খিলাফত সম্পর্কে কুরআনে কি বলা হয়েছে?

খিলাফত শব্দটি আলোচনার ক্ষেত্রে খলিফা শব্দটি এসে যায়। খলিফা শব্দটির আভিধানিক অর্থ স্থলবর্তি, উত্তরাধিকারী, শাসনকর্তা, প্রতিনিধিত্বকারী, সেনাপ্রধান, উত্তরসূরী। ইসলামের শরিয়তের পরিভাষায় খলিফা অর্থ বাদশাহ বা সম্রাটের কাছাকাছি। খলিফা হল ইসলামিক রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী। তিনি শরিয়ত অনুযায়ী ইসলামিক রাষ্ট্রের সমস্ত উম্মাতকে পরিচালনা করেন। এখন প্রশ্ন হল খিলাফত কি? খিলাফত অর্থ রাজত্ব অর্থাৎ মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব এবং ইসলামিক রাষ্ট্রের ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা। খিলাফত শব্দের অর্থ কি? খিলাফত শব্দের অর্থ মুসলিম বিশ্বের জন্য একটি আধ্যাত্মিক ঐক্যবদ্ধ ইসলামী সরকার গঠন করা। সহজ ভাষায় খিলাফত হল ইসলামিক শরিয়ত অনুযায়ী ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থা। এককথায় ইসলামিক সরকার পদ্বতির নাম হল খিলাফত। খিলাফত শাসনব্যবস্থায় সরকারী প্রধানকে খলিফা বলা হয়। নীচে ইসলামিক শরিয়ত অনুযায়ী খলিফা বা খিলাফত সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

খিলাফত অর্থ কি

খলিফা: খলিফা শব্দটি কুরআনে উল্লেখ আছে। আল্লাহ বলেছেন “আমি পৃথিবীতে প্রতিনিধি সৃষ্টি করছি।” এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ্ তাআলা হযরত আদম অর্থাৎ বনী আদমকে পৃথিবীতে খলিফা বানিয়েছেন। বনী আদমের আশরাফুল মাখলুকাত হওয়া স্পষ্ট এবং মানব জাতির সৃষ্টিজগতের উপর শাসনকর্তা হওয়া পরিষ্কার। তাই এই পার্থিব মানব খিলাফত নিঃসন্দেহে আল্লাহর খিলাফত এবং মানব জাতি হচ্ছে আল্লাহর খলিফা। আল্লাহ্ সবার স্রষ্টা ও মালিক। তাই পৃথিবীতে মানব জাতিকে অন্যান্য প্রতিটি সৃষ্টির শাসক বলা যায়। তাই বলা যায় খলিফা অর্থ শাসনকর্তা।

কুরআন করীমের এক স্থানে বলা হয়েছে “তিনিই তােমাদেরকে দুনিয়ার প্রতিনিধি করেছেন এবং তােমাদের কতককে অপরের উপর মর্যাদায় উন্নীত করেছেন” (আল আনআম:১৬৫)। অর্থাৎ আল্লাহ তােমাদের জাতিকে শাসক জাতি বানিয়েছেন। অন্যান্য মানব শ্রেণী তােমাদের অধীনস্থ এবং তােমরা শাসক জাতি। এখানেও সেই খলিফা শব্দই বিদ্যমান, যার অর্থ শাসক। অন্যত্র বলা হয়েছে “হে দাউদ ! আমি তােমাকে পৃথিবীতে প্রতিনিধি করেছি” (ছোয়াদ:২৬)। অর্থাৎ এখানেও হজরত দাউদ (আ) এর রাজত্ব ও সাম্রাজ্যের উল্লেখ রয়েছে। এখানেও খলিফা শব্দটি বর্তমান যার অর্থ বাদশাহ বা সম্রাট। হযরত দাউদ (আ) এর এই রাজত্ব ও সাম্রাজ্য সম্পর্কে অন্যত্র বলা হয়েছে “আমি তার রাজ্যকে সুদৃঢ় করেছিলাম” (ছোয়াদ:২০)। অতঃপর বিশিষ্ট মুসলমানগণ বিশেষত সাহাবায়ে কিরাম সম্পর্কে বলা হয়েছে “যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে আল্লাহ তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন যে, তিনি তাদেরকে পৃথিবীতে প্রতিনিধিত্ব দান করবেনই, যেমন তিনি প্রতিনিধিত্ব দান করেছিলেন তাদের পূর্ববর্তীদেরকে” (আন নূর:৫৫)। অর্থাৎ যেমনিভাবে পৃথিবীতে আমি অন্যান্য মানুষকে শাসক বানিয়েছিলাম, তেমনিভাবে তােমাদের মধ্য থেকে যারা ঈমান আনবে এবং সংকর্ম করবে, তাদেরকে পৃথিবীতে শাসন ক্ষমতা দান করা হবে।

খিলাফত: কুরআনে বিভিন্ন স্থানে উল্লেখ আছে, পৃথিবীতে রাজত্ব ও সালতানাত তথা খিলাফত প্রদান করা অথবা রাজত্ব ও সালতানাত কারাে কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়া আল্লাহর বিশেষ কাজ। যদিও প্রত্যেক কাজের প্রকৃত কর্তা আল্লাহ। এক স্থানে পরিষ্কারভাবে বলেছেন “বলো, হে সার্বভৌম শক্তির মালিক আল্লাহ ! তুমি যাকে ইচ্ছা ক্ষমতা প্রদান করাে এবং যার নিকট হতে ইচ্ছা ক্ষমতা কেড়ে লও” (আল ইমরান : ২৬)। তাই বলা যায় আল্লাহই কোন লােককে খিলাফত বা রাজত্ব দান করেন। অর্থাৎ এখানে জানা দরকার যারা খিলাফত লাভ করেন তাদের বৈশিষ্ট্য কি? আদম বা বনী আদম যে পৃথিবীবাসীর উপর রাজত্ব লাভ করেছে, তার কারণ কুরআনে উল্লেখ আছে, তা হল ইলম বা জ্ঞান। কুরআনে উল্লেখ আছে “তিনি আদমকে যাবতীয় নাম শিক্ষা দিলেন” (আল বাকারা : ৩১)।

আল্লাহ গুণকীর্তন করাকে খিলাফতের অধিকার ও নিদর্শন সাব্যস্ত করেছেন। মানব জাতি নিজ প্রশস্ত জ্ঞানের দরুনই অন্যসব সৃষ্ট বস্তুর উপর রাজত্ব লাভ করেছে। জ্ঞানের দৌলতে বাঘ, হাতি, নদী, পাহাড়, বাতাস, আগুন, বিদ্যুৎ প্রভৃতি সবকিছুকেই মানুষের সেবা, আনুগত্য ও আরামদানের জন্য প্রস্তুত ও গােলামের মতাে অনুগত দৃষ্ট হয়েছে। কুরআনে উল্লেখ আছে তালুতের রাজত্বের উপর যখন লােকেরা আপত্তি জানালো, তখন আল্লাহ তাঁর নবীর মাধ্যমে আপত্তিকারীদের জবাব দিলেন যে, “আল্লাহই তাকে তােমাদের জন্য মনােনীত করেছেন এবং তিনি তাকে জ্ঞানে ও দেহে সমৃদ্ধ করেছেন। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা স্বীয় কর্তৃত্ব দান করেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময়, প্রজ্ঞাময়” (আল বাকারা : ২৪৭)। হযরত দাউদ (আ) -কে রাজত্ব ও খিলাফত দান করে আল্লাহ আদেশ করেন যে, “অতএব তুমি লােকদের মধ্যে সুবিচার করাে এবং খেয়ালখুশীর অনুকরণ করাে না” (ছোয়াদ : ২৬)।

কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে, “তােমাদের পূর্বে বহু মানব গােষ্ঠীকে আমি ধ্বংস করেছি যখন তারা সীমা অতিক্রম করেছিল। স্পষ্ট নিদর্শনসমূহ তাদের নিকট তাদের রাসূল এসেছিল, কিন্তু তারা বিশ্বাস করার জন্য প্রস্তুত ছিল না। এইভাবে অপরাধী সম্প্রদায়কে প্রতিফল দিয়ে থাকি। অতঃপর আমি তাদের পর পৃথিবীতে তােমাদেরকে স্থলাভিষিক্ত করেছি, তােমরা কি প্রকার আচরণ করাে, তা দেখার জন্য” (ইউনুস : ১৩-১৪)। কুরআনে এই প্রকার অনেকে আয়াত আছে যাতে খলিফা অর্থ শাসক ও খিলাফত অর্থ রাজত্ব। আর রাজত্ব ও রাজ্য শাসনের জন্য অপরিহার্য হল জ্ঞান, সুবিচার, শক্তি, সংস্কার ও জনকল্যাণ, রাজা – বাদশাহ ও খলিফাদের জন্য যা সব সময় আবশ্যক ছিল এবং এসব শর্ত ও গুণ ছাড়া কোন বাদশাহ বা কোন সুলতান তার রাজত্ব ও সালতানাত টিকিয়ে রাখতে পারেন না। খিলাফত মূলত রাজত্ব ও সালতানাত ধৈর্য ছাড়া আর কিছু নয়। খলিফা বা রাজা-বাদশাহ আল্লাহ যাকে ইচ্ছা বানান এবং যখন কোন শাসক জাতি জাতিগতভাবে জুলুম-অত্যাচারে পথ অবলম্বন করে, তখন আল্লাহ তাদের নিকট থেকে রাজত্ব বা খিলাফত ছিনিয়ে নেন এবং অন্য যাকে ইচ্ছা তা দান করেন।

এখানে উল্লেখ্য যে, মুসলমানদের মধ্যে খলিফা কেবল সেই রাজা-বাদশাহ বা শাসককেই বলা যেতে পারে, যিনি হযরত মুহাম্মদ (সা) -এর প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র ও সালতানাতের উত্তরাধিকারী এবং সালতানাতে তার স্থলাভিষিক্ত রূপে দ্বীন কার্যাবলী অর্থাৎ সালাত, ফাতওয়া, রোজা, জিহাদ প্রভৃতির বন্দোবস্ত ও শরিয়তের আহকাম পালনের জন্য জনগণকে উদ্বুদ্ধ ও উৎসাহিত করেন। ইসলামী শরীয়ত ইহলৌকিক ও পারলৌকিক উভয় কল্যাণের বাহক। ইসলামী শরীয়তে বলা হয়, মুসলিম জনগণ সেই রাষ্ট্র ও সালতানাতের অধীনেই জীবন যাপন করবে যা ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী প্রতিষ্ঠিত হয়। অর্থাৎ ইসলামী শরিয়তের সঙ্গে খিলাফতের বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। শরিয়তের কানুন অনুযায়ী যে রাষ্ট্র পৃথিবীতে কায়েম হয়েছিল, তা ছিল নবী করীম (সা) ও তাঁর সাহাবায়ে কিরামের রাষ্ট্র। মুসলিম ইতিহাসে শরিয়ত অনুযায়ী প্রথম উৎকৃষ্ট খিলাফত ছিল রাশিদুন খিলাফত। এরপর যদিও খিলাফতের নামে ইসলামী রাষ্ট্রের ধারা আজ পর্যন্ত অব্যাহত রয়েছে, কিন্তু তাতে অল্প বিস্তর পার্থিব রাজা-বাদশাহদের রীতি-নীতি যােগ হতে থাকে এবং সেই হারেই শরিয়ত রাষ্ট্র ও শরিয়ত আইনের রূপ পরিবর্তন হতে থাকে।

কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, “হে মানুষ ! আমি তােমাদেরকে সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী হতে, পরে তােমাদেরকে বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গােত্রে, যাতে তােমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পারাে। তােমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই আল্লাহর নিকট অধিক মর্যাদাসম্পন্ন, যে অধিক মুত্তাকী। আল্লাহ সবকিছু জানেন, সমস্ত খবর রাখেন (আল হিজর : ৯)। ইজ্জত, সম্মান, রাষ্ট্রক্ষমতা ও শ্রেষ্ঠত্ব আল্লাহর পক্ষ থেকে সর্বদা যােগ্য লােকদেরই দেওয়া হয়ে থাকে। সে যে কোন গােত্র, গােষ্ঠী ও জাতিরই হােক না কেন। সম্মানের অধিকারী হওয়ার জন্য শর্ত হচ্ছে তাকওয়া ও ঈমান। রাষ্ট্রক্ষমতা ও খিলাফতের জন্যও আল্লাহ্ জ্ঞান, স্বাস্থ্য, দৈহিক শক্তি, তাকওয়া, সুবিচার, সংস্কার প্রভৃতি শর্ত জরুরী করেছেন। কোন বিশেষ জাতি-গােষ্ঠীর শর্ত আরােপ করেননি। ইসলাম বাদশাহ ও গােলামকে পাশাপাশি এক কাতারে দাঁড় করিয়েছে। ইসলাম হযরত নবী করীম (সা) -এর দ্বারা ঘােষণা করিয়েছে যে, জনমণ্ডলী ! কোন সাধারণ হাবশী গােলামও যদি তােমাদের শাসক বা খলিফা নিযুক্ত হয়, তবে তােমরা তার আনুগত্য করবে। মােটকথা, ইসলাম গােত্রীয় ও বংশীয় অহমিকার প্রতিমাকে টুকরাে টুকরাে ও চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছে।

হযরত নবী করীম (সা) অন্তিমশয্যায় ভবিষ্যতবাণী করেন যে, “আমার পরে ত্রিশ বছর খিলাফত, তারপর রাজতন্ত্র। তারপর তিনি আল্লাহর নিকট থেকে পরবর্তী ভবিষ্যতবাণী করেন যে, “ইমাম কুরায়শের মধ্যে থেকে”। নিঃসন্দেহে বলা যায় সেখানে কুরায়শের মধ্যেই মেধা, জ্ঞান ও তাকওয়া বিদ্যমান ছিল এবং এই সব সৎ গুণের মধ্যেই নিহিত ছিল অন্যদের উপর তাদের শ্রেষ্ঠত্ব। তাই আল্লাহ তাদেরকে খিলাফতের জন্য নির্বাচিত করেন। তারপর যখন তাদের সেই অবস্থা নষ্ট হয়ে গেল তখন অন্য লােকদের মধ্য থেকে যাকে খিলাফত পদের জন্য উত্তম মনে হতাে আল্লাহ তাকে খিলাফত ও রাষ্ট্রক্ষমতা দান করেন।

সর্বশেষ বলা যায়, মুসলিম দুনিয়ার প্রথম চারজন খলিফা ছিল সর্বোত্তম। আল্লাহ খলিফা বা খিলাফত অর্থ বোঝানোর জন্য হজরত আদম ও হজরত দাউদ এর উল্লেখ করেছেন। খিলাফতের সম্পূর্ণ অর্থ কুরআনে উল্লেখ আছে। যদি কেউ খিলাফতের অর্থ বা ব্যাক্ষা নিজের মতো করে তবে সেটা হবে সম্পূর্ণ ভুল। আমাদের কুরআনের পরিভাষায় গ্রহণ করতে হবে।