কুষাণ সম্রাট কণিষ্কের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অবদান

মৌর্য-পরবর্তী যুগে যে সব বৈদেশিক জাতি ভারতে রাজ্য স্থাপন করেছিল তাদের মধ্যে কুষাণ জাতির ভূমিকা ছিল পুরােভাগে। মধ্য এশিয়ার এক বৈদেশিক জাতি থেকে উদ্ভূত হলেও কুষাণরা ভারতের সমাজ, রাজনীতি ও সংস্কৃতির মধ্যে অঙ্গীভূত হয়ে পড়েছিল। কুষাণ বংশের ইতিহাসের সর্বাধিক অগ্রগতি ঘটেছিল ঐ বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ রাজা কণিষ্কের গৌরবময় শাসনকালে। উত্তরাধিকার সূত্রে কণিষ্ক পিতা বিম কদফিসের সিংহাসনে বসেন। কণিষ্কের সময়কাল নিয়ে ঐতিহাসিকদের তুমুল বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। ড: ফ্লিট ও কানিংহাম প্রমুখ ঐতিহাসিকদের মতে, কণিষ্ক ৫৮ খ্রিষ্টাব্দে সিংহাসনে বসেন এবং তিনি বিক্রম সম্বৎ প্রবর্তন করেছিলেন। ফাগুর্সন, টমাস প্রমুখ পণ্ডিতদের মতে তিনি ৭৮ খ্রিস্টাব্দে সিংহাসনে বসেন এবং শকাব্দ নামে একটি সম্বৎ বা অব্দ প্রবর্তন করেন করেন।

কণিষ্ক ছিলেন একজন যােগ্য ও প্রতিভাসম্পন্ন শাসক। বিজেতা ও প্রশাসক দুদিকেই কণিষ্ক অসাধারণ কর্মকুশলতা ও সাফল্যের পরিচয় দিয়েছিলেন। কুষাণ রাজাদের মধ্যে কণিষ্ক ছিলেন শ্রেষ্ঠ। সাম্রাজ্যের সংগঠক, বৌদ্ধধর্মের প্রচারক ও শিল্প সংস্কৃতির পৃষ্ঠপােষক হিসাবে তার কৃতিত্ব কুষাণ যুগকে রীতিমতাে উল্লেখযােগ্য করে তুলেছে।

কনিষ্কের রাজ্যজয়: কণিষ্কের সিংহাসনারােহণের সময় আফগানিস্তান, সিন্ধুর এক বিরাট অংশ, পাঞ্জাব, পার্থিয়া এবং ব্যাকট্রিয়ার কিছু অংশ কুষাণ সাম্রাজ্যভুক্ত ছিল। কণিষ্ক এই সাম্রাজ্যকে আরও বিস্তৃত করেন। শিলালিপি, মুদ্রা ও বিভিন্ন সাহিত্য থেকে তার রাজ্যজয় সম্পর্কে ধারণা করা যায়। কলহনের রাজতরঙ্গিনী ও অন্যান্য সূত্র থেকে জানা যায় যে, কাশ্মীর তার সাম্রাজ্যভুক্ত ছিল। কাশ্মীরে তিনি বহু সৌধ ও কণিষ্কপুর নামক শহর প্রতিষ্ঠা করেন। বারাণসী -তে তার শিলালিপি পাওয়া গেছে। সৌরাষ্ট্র ও মালবে রাজত্বকারী শক-রাজা নহপান তার আনুগত্য মেনে নেন। সাঁচি ও মথুরা তার সাম্রাজ্যভুক্ত ছিল। হিউয়েন সাঙ -এর রচনা থেকে গান্ধার, পুরুষপুর প্রভৃতি অঞ্চলের উপর তার আধিপত্যের কথা জানা যায়। চৈনিক ও তিব্বতীয় উপাদান থেকে জানা যায় যে, তিনি পূর্ব ভারত, অযােধ্যা ও পাটলিপুত্র জয় করেছিলেন। বৌদ্ধ কিংবদন্তী অনুসারে পাটলিপুত্র আক্রমণকালে বৌদ্ধ দার্শনিক অশ্বঘােষকে বন্দি করে কণিষ্কের রাজধানীতে নিয়ে যাওয়া হয়। অশ্বঘােষ কণিষ্কের রাজসভা অলঙ্কত করতেন। মনে হয় যে, মগধের কিছু অংশ কুষাণ সাম্রাজ্যভুক্ত ছিল। সম্ভবত গাজিপুর ও গােরক্ষপুর পর্যন্ত তার রাজ্য বিস্তৃত ছিল। অল্ বিরুনি আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন স্থানের উপর তার আধিপত্যের কথা বলেছেন। অনেকের মতে চিনের সঙ্গে যুদ্ধে জয়লাভ করে তিনি মধ্য এশিয়ার কিছু অঞ্চল অধিকার করেন। মিথ -এর মতে, এই অঞ্চলগুলি হল কাশগড়, ইয়ারখন্দ ও খাটান। মনে হয় এই সাফল্য তার রাজত্বকালের সূচনা পর্বে অর্জিত হয়েছিল। তার রাজত্বকালের শেষ দিকে চিন সম্রাট হাে-তি’র সেনাপতি প্যান-চাও -এর হাতে তিনি শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন এবং এর ফলে তার মধ্য এশিয় সাম্রাজ্য ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। ডঃ রােমিলা থাপার -এর মতে, মধ্য এশিয়ার এই যুদ্ধে কণিষ্ক নিহত হন।

রাজ্যসীমা: ভারতের অভ্যন্তরে উত্তরে কাশ্মীর থেকে দক্ষিণে সাঁচি এবং পূর্বে বারাণসী থেকে পশ্চিমে সিন্ধুনদ পর্যন্ত তার সাম্রাজ্য বিস্তৃত ছিল। অনেকের মতে তার সাম্রাজ্যের আয়তন আরও বড়াে ছিল এবং তা পূর্বে বিহার পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। বলা বাহুল্য, বাংলা ও বিহারে তার মুদ্রা পাওয়া গেলেও, এই স্থান দুটি তার সাম্রাজ্যভুক্ত ছিল কিনা — এ সম্পর্কে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। ভারতের বাইরে কাশগড়, খােটান, ইয়ারখন্দ, কাবুল, কান্দাহার, আফগানিস্তান, বেলুচিস্তান ও ব্যাকট্রিয়া তার সাম্রাজ্যভুক্ত ছিল। পুরুষপুর বা পেশােয়ার কনিষ্কের রাজধানী ছিল।

কনিষ্কের ধর্মমত: ডঃ হেমচন্দ্র রায়চৌধুরীর মতে রাজ্যজয় অপেক্ষা বৌদ্ধ ধর্মের উৎসাহী পৃষ্ঠপােষক হিসেবে কণিষ্ক স্থায়ী কীর্তির অধিকারী হয়েছেন। স্মিথ -এর মতে, বৌদ্ধ ধর্মের ইতিহাসে তিনি দ্বিতীয় অশােকের ভূমিকা পালন করেন। তিনি পুরােনাে বৌদ্ধ মঠ, বিহার ও চৈত্যগুলি সংস্কার এবং বহু নতুন মঠ, স্তূপ ও চৈত্য নির্মাণ করেন। বৌদ্ধ মঠ ও ভিক্ষুদের দানের ব্যাপারেও তিনি মুক্তহস্ত ছিলেন। রাজধানী পুরুষপুর বা পেশােয়ারে বুদ্ধদেবের দেহাবশেষের উপর তিনি একটি বহুতল বিশিষ্ট বিশাল চৈত্য ও মঠ নির্মাণ করেন। বৌদ্ধ ধর্মের পরস্পর বিরােধী বিভিন্ন গােষ্ঠীর মতপার্থক্য দূর করে বৌদ্ধ ধর্মকে একটি সুসংহত রূপ দান করার উদ্দেশ্যে বিখ্যাত বৌদ্ধপণ্ডিত বসুমিত্র -র নেতৃত্বে তিনি কাশ্মীরে (মতান্তরে জলন্ধরে) চতুর্থ বৌদ্ধ সংগীতি বা মহাসম্মেলনের আয়ােজন করেন। এই সম্মেলনে মহাযান ধর্মমতের উদ্ভব ঘটে এবং বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থগুলিকে সংস্কৃত ভাষায় অনুবাদের ব্যবস্থা করা হয়। তিনমাসব্যাপী এই অধিবেশনে গৃহীত ও সংকলিত ত্রিপিটকের ব্যাখ্যাসমূহ মহাবিভাষ্য নামে পরিচিত। এটির রচয়িতা হলেন বসুমিত্র। তার পৃষ্ঠপােষকতায় মহাযান বৌদ্ধধর্ম তিব্বত, চিন, জাপান, কোরিয়া ও মধ্য এশিয়ার নানাস্থানে বিস্তৃত হয়। বৌদ্ধ ধর্মের উৎসাহী পৃষ্ঠপােষক হওয়া সত্ত্বেও তিনি পরধর্মমতসহিষ্ণু ছিলেন। তার মুদ্রায় গ্রিক, পারসিক ও হিন্দু দেবদেবীর মূর্তি অঙ্কিত ছিল।

কনিষ্কের সাহিত্য ও শিল্প: কণিষ্ক সাহিত্য ও শিল্পের উৎসাহী পৃষ্ঠপােষক ছিলেন। মৌর্যযুগে সংস্কৃত ভাষা প্রায় অবলুপ্ত হয়ে যায়, কিন্তু কণিষ্কের আমলে সংস্কৃত ভাষা তার হৃতগৌরব ফিরে পায়। এই যুগে প্রচুর সংস্কৃত গ্রন্থ রচিত হয় এবং বহু যুগন্ধর সাহিত্যিক, দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিকের আবির্ভাব ঘটে। বিখ্যাত কবি, দার্শনিক, সংগীতজ্ঞ ও পণ্ডিত অশ্বঘােষ, দার্শনিক নাগার্জুন, সাহিত্য ও শিল্প পণ্ডিত ও শিক্ষাগুরু বসুমিত্র ও পার্শ্ব, রাজনীতিবিদ মাথর, আয়ুর্বেদ শাস্ত্রবিদ চরক, স্থপতি এজেসিলাস রাজসভা অলংকৃত করতেন। অশ্বঘােষ রচনা করেন বুদ্ধচরিত, সূত্রালঙ্কার, সৌন্দরানন্দ কাব্য’ ও ব্রজসূচী নামক গ্রন্থ। নাগার্জুন ছিলেন বিখ্যাত বৌদ্ধদর্শন প্রজ্ঞা-পারমিতা-শত-সহস্রিকা গ্রন্থের রচয়িতা। এছাড়া তিনি তার বিখ্যাত মাধ্যমিক সূত্র গ্রন্থে আপেক্ষিক তত্ত্ব -র প্রাথমিক সূত্রগুলি লিপিবদ্ধ করেন। চরক রচনা করেন আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের বিখ্যাত গ্রন্থ চরক সংহিতা। সাহিত্য, দর্শ , কবিতা, নাটক, সংগীতচর্চা সব দিকেই তার রাজত্বকাল এক উল্লেখযােগ্য অধ্যায়। স্থাপত্য, ভাস্কর্য ও চিত্রকলার ইতিহাসেও কণিষ্কের রাজত্বকাল এক নবযুগ হিসেবে চিহ্নিত। তার আমলে নির্মিত মথুরা, তক্ষশিলা, পেশােয়ার প্রভৃতি শহর, অসংখ্য স্তূপ, বিহার ও চৈত্যগুলি তার শিল্প প্রীতির স্বাক্ষর বহন করে। তার রাজত্বকালে মথুরা, সারনাথ, অমরাবতী ও গান্ধার — এই চারটি স্থানে চারটি পৃথক শিল্পরীতির বিকাশ ঘটে। তার রাজত্বকালে গ্রিক, রােমান ও ভারতীয় শিল্পরীতির সমন্বয়ে উদ্ভূত গান্ধার শিল্প উন্নতির চরম শিখরে আরােহণ করে। তার রাজত্বকালে যে নবজাগরণের সূচনা হয় গুপ্তযুগে তা চরমভাবে বিকশিত হয়।

কনিষ্কের কৃতিত্ব: ভারতে কুষাণ রাজাদের মধ্যে কণিষ্ক ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ। তার মধ্যে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের রণােন্মাদনা ও আশােকের ধর্মীয় উদ্দীপনার এক অপূর্ব সমন্বয় লক্ষ যায়। তার পূর্বে কোনও বিদেশি নরপতি ভারত ও ভারতের বাইরে এত সুবিশাল সাম্রাজ্য স্থাপনে সক্ষম হন নি। মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের পর রাজনৈতিক অনৈক্য ও হানাহানির যুগে আর্যাবর্তের এক বিশাল স্থানে তিনি কেবলমাত্র রাজনৈতিক ঐক্যই স্থাপন করেন নি — সুষ্ঠু শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করে দেশের শান্তিও ফিরিয়ে এনেছিলেন। কেবলমাত্র বৌদ্ধ ধর্মের পৃষ্ঠপােষকতাই নয়, অন্যান্য ধর্মের প্রতিও তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল উদার। শিল্প, সাহিত্য ও শিক্ষার প্রতি তার পৃষ্ঠপােষকতার জন্য তাকে ‘গুপ্ত নবজাগরণের পুরােধা’ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। ১০২ খ্রিষ্টাব্দে কনিষ্কের মৃত্যুর পর তার পুত্র বাসিষ্ক সিংহাসনে বসেন।

Q. কণিষ্কের রাজধানীর নাম কি?

পুরুষপুর বা পেশােয়ার।

Q. কনিষ্কের সভাকবি কে ছিলেন?

অশ্বঘােষ।

Q. কনিষ্ক কে ছিলেন?

কনিষ্ক ছিলেন কুষাণ বংশের সর্বশ্রেষ্ট শাসক।

RELATED POSTS