একটি নদীর আত্মকথা প্রবন্ধ রচনা

ঘুম ভাঙলো। ঘুম ভাঙলাে জলের কলকল শব্দে। আর পাখির কলকাকলিতে। কথায় আছে, বিন্দু বিন্দু ধুলােবালি জমে জমে হয় বিশাল মরুভূমি, আর বিন্দু বিন্দু জল জমে হয় সমুদ্র। তা পাহাড়ের ওপর বৃষ্টির জল একদিনে জমতে জমতে ভরে উঠল একটি গুহা। সেই ভরে-ওঠা গুহা থেকে জল উপচে পড়ার সময় হল। জেগে উঠল জলের কল্লোল। অন্ধকারের বন্ধ গুহা থেকে যেমনই মুক্তি পেলাম, শুনতে পেলাম পাখির কাকলি। গায়ে লাগল সূর্যের অলােক। প্রভাত রবির রশ্মি আগেই এসে পড়েছিল অন্ধকার গুহার ভেতর, পাথরের সরু ফাটল দিয়ে। কেমন যেন শীতশীত ভাব। মনের ভেতর কেমন যেন এক অস্থিরতা। ব্যাকুল করা অধীর চঞ্চলতা আমার হৃদয়ের ভেতর দাপাদাপি করতে থাকল। আমি বেরিয়ে পড়তে চাইলাম। এবং আমি যে — একটি নদী হয়ে গিয়েছি, তা বেরিয়ে পড়বার পরের মহুর্তেই বুঝতে পারলাম। সঙ্গে সঙ্গে একটা কবিতাও আনন্দে আমার মুখ থেকে বেরিয়ে এল—
“আজি এ প্রভাতে রবির কর
কেমনে পশিল প্রাণের’ পর
কেমনে পশিল গুহার আঁধারে
প্রভাত পাখির গান।
না জানি কেনরে এতদিন পরে
জাগিয়া উঠিল প্রাণ।”

আমি গঙ্গা: প্রাণ জেগে উঠল। প্রাণ জেগে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে আমাকে পাহাড়ি পথ ভেঙে নেমে আসতে হল লােকালয়ে পথে। কেননা, এখন আমি একটি নদী। আমার নাম, গঙ্গানদী। বহু পথ পাড়ি দিয়ে, বহু বাধা অতিক্রম করে আমাকে পৌছাতে হবে সাগরে। আমার ভগিনী যমুনাও আর এক পাহাড় থেকে দৌড়ে নেমে এল পিছু পিছু। আমার যাত্রা শুরু হল গঙ্গোত্রী থেকে। আর যমুনার হল যমুনােত্রী থেকে।

পৌরাণিক কথা: আমাকে ঘিরে মানুষের ইতিহাসে নানা কাহিনি। নানা কিংবদন্তি। পুরাণেও বর্ণিত আছে অনেক গল্প। তবে মুক্তিদায়নি হিসাবে আমাকে স্বর্গ থেকে যে নামিয়ে আনার প্রার্থনা করে উচ্চারিত হয়েছিল, তা আমি আজও স্পষ্ট ভাবে মনে করতে পারি। সগর রাজার ৬০ হাজার ছেলের মুক্তির জন্য আমার মর্তলােকে নেমে আসা ছিল তখন বড়োই জরুরি। তাই ভগীরথের আকুল প্রার্থনায় আমাকে সাড়া দিতে হল। ব্রহ্মলোক থেকে আসতে হল পৃথিবীতে। আমার প্রচণ্ড তরঙ্গভঙ্গে একদা ভেসে গিয়েছিল ঐরাবত। ভগীরথের প্রতি অনুকম্পা দেখাতে জটাধর শিব শেষ পর্যন্ত রাজি হলেন আমার প্রবাহ ও তরঙ্গবেগকে রাজি হলেন আমার প্রবাহ ও তরঙ্গ বেগকে ধারণ করতে। জটাধর শিব আমার মর্ত-অবতরণের তরঙ্গবেগ ধারণ করলেন মাথায়। তবে একবার কৌতুক করে জটার গভীরে পথহারা করে দিলেন আমাকে। যাই হােক, দেবাদিদেব মহাদেবকে আমার ভালাে লেগেছিল। তারও নিশ্চয় ভালাে লেগেছিল আমাকে। নতুবা গঙ্গাধর নাম তিনি গ্রহণ করবেন কেন? পুরাণ কাহিনিতে আমাকে ঘিরে অনেক বৃত্তান্ত লিখিত হয়েছে। আছে জহুমুনির গল্প। আছে রাজা শান্তনু এবং অষ্টবসুর কথা। পুত্র ভীষ্মতাে গঙ্গাপুত্র নামেই মহাভারতে বিখ্যাত। আমার এসব কাহিনি ভারতবাসীরা জানে, সুতরাং সেসব পুনরাবৃত্তি করা বাহুল্য মাত্র।

অন্য নদীর সঙ্গে তুলনা: যে পাহাড়ি রাস্তা ও জনপদ অতিক্রম করে আমি এসে পৌছেছি সাগরে, এই পথের দৈর্ঘ্য কতখানি ? একালের মানুষের হিসাবে তা’হল দু’হাজার পাঁচশাে দশ কিলােমিটার। দৈর্ঘ্যের পরিমাণে আমি আমার দুই দাদার থেকে বেশ খানিকটা কম। আমার এই দুই দাদা হলেন ব্রহ্মপুত্র এবং সিন্ধু। ওঁরা দু’জনেই পুরুষ। সুতরাং নদ। ওরা যমজ নয়, কিন্তু ওদের দুজনের দৈর্ঘ্য একাল সমান — দু’হাজার নশাে কিলােমিটার। ওঁরা দীর্ঘদেহী, দাদা, অথচ আমার মতাে ওঁরা ভারতবাসীর কাছে শ্রদ্ধেয় নন। দক্ষিণাপথে আমারই মতাে যারা ভগিনী রয়েছে, তারা হল গােদাবরী, নর্মদা, কৃষ্ণা এবং কাবেরী। ওড়িশার মহানদীকেও আপনারা চেনেন। এদের ভেতর গােদাবরীই হল দীর্ঘাঙ্গী, তার পথের দৈর্ঘ্য হল, ১৪৫০ কিলােমিটার। নর্মদা এবং কৃষ্ণা হল ১২৯০ কিলােমিটার। কাবেরী ও মহানদীর পথ অনেক কম। বলতে দ্বিধা নেই, আমার ভারতের ভগিনীরা আমার মতাে দীর্ঘপথ আর কেউই পরিক্রমা করেন না। যমুনা ও সরস্বতী আমার কাছে এসে এক সময় মিশেই গেছে। সুতরাং ওদের কথা তােলাই ভালাে।

মর্তলোক: আমি গঙ্গা, আমি ত্রিলােক ব্যাপ্ত। আমি স্বর্গে ‘মন্দাকিনী’, পাতালে ‘ভােগবতী’। মর্তে আমি হয়েছি ভাগীরথী। সত্যি কথা বলতে কী, স্বর্গ এবং পাতালের থেকে আমার বেশি পছন্দ এই মর্তভূমি — অর্থাৎ ভারতভূমি। মহাদেবের জটা থেকে নামবার পর পাহাড়ি পথ পেরিয়ে একটু একটু করে এগােতে থাকলাম। হৃষিকেশ পেরিয়ে হরিদ্বারে আসবার সঙ্গে সঙ্গে আমি ওঁদের কাছে দেবী হয়ে গেছি। হরিদ্বারে ‘হর-কা-পৌরি’তে আমার মূর্তি প্রতিষ্ঠিত আছে। প্রতি সন্ধ্যায় আমার আরতি হয়। এইভাবে আমার সঙ্গে এগােতে এগােতে পথে পাবেন বারাণসী ধাম পাবেন প্রয়াগ যেখানে আমি হয়েছি ত্রিবেণী। ভাগলপুর পেরিয়ে আসবার পর আমার পথ একটি জায়গায় ঘুরে গেছে জহুমুনির আশ্রমের জন্য। ক্রোধ মুনি আমাকে উদরস্থ করে ফেলেছিলেন। পরে জানু চিরে বের করে দেন সুলতানগঞ্জের কাছে। সেইজন্য আমার আরেক নাম জাহ্নবী। এইভাবে একটির পর একটি পুণ্য ক্ষেত্র তৈরি করে আমি এসে পৌছেছি সাগরে। ভারতীয় পুণ্যার্থীরা আমার জলে স্নান করে নিজেদের ধন্য মনে করে। আমার জলকে তারা মনে করে পবিত্রতম।

অন্নদা: দু’হাতে কেবল পুণ্য বিতরণ করেই কিন্তু আমি থেমে থাকিনি। আমি আসবার পথে দু’দিকের জনপদে শস্য বিলােত বিলােতে এসেছি। প্রায় কুড়ি কোটি ভারতবাসীকে আমি অন্ন জোগাই। সেদিক থেকে আমাকে যদি কেউ অন্নদাত্রী বলেন, তিনি নিশ্চয় ভুল বলবেন না। আমি সেই অনাদিকাল থেকে ভারতের সভ্যতা বিকাশের সঙ্গে মিশে রয়েছি। আমার বুকেই ওদের নৌকো, বজরা ইত্যাদি ভাসে ও বাহিত হয়। আমার ধারে ধারে তৈরি হয়েছে ঘাট। সেই ঘাটে হিন্দুরা গান করে, পুজো করে। আমার তীরে তীরে ভারতীয় হিন্দুদের মৃতদেহ পােড়ানাে হয় এবং শেষে দগ্ধ দেহাংশ ভাসিয়ে দেওয়া হয় আমার জলেই।

কাব্য আমি: আমি এক অর্থে ভারতীয় সভ্যতার প্রতীক। আমাকে বাদ দিয়ে ভারতীয়রা কিছু ভাবতেই পারে না। আমাকে নিয়ে কবিতা লেখা হয়। ‘সুরধুনী কাব্য’ আমারই জীবনকথা। এ কাব্য একজন বাঙালি কবি লিখেছেন। তবে এই সঙ্গে একটা কথা বলা বড়ােই জরুরি।

গঙ্গাদুষণ মুক্তি: ইদানীংকালে ভারতবর্ষে কলকারখানা বৃদ্ধি এবং বড়াে বড়াে শহরের প্রতিষ্ঠা আমার তীরে তীরে হওয়ার ফলে বাড়তি এক সংকট সৃষ্টি করেছে। যেহেতু আমি পতিতপাবনী এবং কলুষনাশিনী, তাই একালের লােকেরা নগর ও কারখানার আবর্জনা আমার ওপর ঢেলে আমার জলকে আবিল করবার চেষ্টা করছে, যাতে তাদের ওই নানারকমের কুলষও আমি নাশ করি। —কিন্তু এই অপচেষ্টা যারা করছে, তাদের উদ্দেশ্য ভালাে নয়, তাই তাদের বিরুদ্ধে নতুন পরিকল্পনাও তৈরি হচ্ছে। সে পরিকল্পনাটি হল গঙ্গাদূষণ নিরােধ। অর্থাৎ আমার জলে যাতে কোনাে আবর্জনা ও নােংরা না পড়ে, তার ব্যবস্থা। আমাকে নিষ্কলুষ রাখার চেষ্টা। এই ব্যবস্থাই প্রমাণ করে যে ভারতীয়রা আমাকে আজও কত ভালােবাসে।

দেবী: পৃথিবীর ইতিহাসে আমার মতাে সৌভাগ্যবতী আর কে আছে ? আমার মতাে কেউ কী ত্রিলােকব্যাপ্ত হতে পেরেছেন? কেউ কী পেরেছেন দেবী হতে ? হতে পেরেছেন কী কেউ সুরেশ্বরী ? —এই হিসাবে আমি অনন্যা। আমি গঙ্গা।

RELATED POSTS