একজন হকারের আত্মকথা প্রবন্ধ রচনা

কেউ যদি কোনােদিন হাওড়া-বর্ধমান মেইন লাইন ধরে আদিসপ্তগ্রামের দিকে এগিয়ে আসেন, তাহলে কুৎসিত দর্শন ডিগডিগে রােগা চেহারার এক ছোকরাকে তিনি নিশ্চয় নিশ্চয় দেখতে পাবেন। সেই ছোকরাটি একরাশ কলম নিয়ে তাকে সাধাসাধি করবে যে কোনাে একটিকে কেনবার জন্য। সেই হিলহিলে ও ডিগডিগে রােগা চেহারার ছোকাটি আর কেউ নয়, সে হল হকার ‘জব্বার’। এই লাইনে জব্বারকে চেনে না, এমন নিত্যযাত্রী সম্ভবত এখন দুর্লভ। কেউ তাকে ডাকে জবু, কেউ বলেন জব্বার সাহেব। অনেকে কলমের হকার বলেও এই অধমকে ডাকাডাকি করে থাকেন। যাঃ, আমি কবুল করে ফেললাম, আমিই হলাম সেই জব্বার।

হকারের স্বরূপ: আপনাদের কাছে এই অধমের কবুল করতে দ্বিধা নেই, এ জব্বার হল, ‘জাত হকার।’ ‘জাত’ মানে পাকা এবং ওস্তাদ হকার সে। তার গলার স্বরটি শুনেলেই বােঝা যায় এ গলা যেন কেবল ‘হকারি’ করবার জন্যই তৈরি হয়েছে। খরিদ্দারদের প্রসন্ন করবার মতাে এমন ‘কান-এটো-করা হাসি’ আর কোথায় দেখতে পাবেন? আর সবথেকে বড়াে কথা, জব্বারের কাছে দরকষাকষি একদম পাবেন না। জব্বার সব থেকে সস্তায় জিনিস বেচে থাকে। তার সঙ্গে টেক্কা দিতে পারে, এমন হকার এই লাইনে কেউ নেই। জব্বার মানেই একেশ্বর।

কেন অন্য হকার নাই: তা এই লাইনে হকারদের কথা যখন উঠল, তখন পানু পাঁচু আর মেহেরালির কথা একটু বলে নেওয়া দরকার। হকার হিসাবে এই লাইনে এরা খুবই নামকরা। পানু হকারি করে বিক্রি করে পান-সিগারেট। ওর হাসিটি ভারী মনভােলানাে, আর প্রতিটি ট্রেনে ওর খদ্দের বাঁধা। সুতরাং খুব একটা খাটতে হয় না। পাঁচু বিক্রি করে হাজার মলম, দাঁতের মাজন এবং নানা ধরনের টোটকা ওষুধ। ওর কাছে ভালাে কালমেঘ আপনি পাবেন। তবে লােকটা একটু খিটখিটে। খদ্দেরদের বাঁকা কথা ও সহ্য করতে পারে না। তাই কথায় কথায় ঝগড়া বাধে খদ্দেরদের সঙ্গে। মেহের আলী বিক্রি করে ফল। এই ফল কখনও হয় কলা, কখনও লেবু-আপেল, আবার কখনও বা শশা এবং পেয়ারা। লােকটি খুবই পরিশ্রমী। ব্যবহারও ভালাে। তাই ওর ফলের ঝাকা সহজেই খালি হয়ে যায়। এর পরে আমার নাম, জব্বার।

কি ভাবে হকার হলাম: অথচ অধম জব্বারের হকারির কাজ করার জন্য কিন্তু জন্ম হয়নি। তার গােলামি করবার কথা, হকারি নয়। বাপ-মা হঠাৎ মারা গেল ওলাওঠায়। তা ওই রােগ এই জব্বারেরও হয়েছিল, তখনই তার টেসে যাওয়ার কথা। কিন্তু বরাতজোরে টিকে গেল কোনােরকমে। ছেলেবেলায় বেশ মােটামােটা গােলগাল ছিলাম। কিন্তু ওই অসুখটার পর কেমন যেন দুবলা হয়ে গেলাম। তারপর থেকেই হয়ে গেল এই হিলহিলে চেহারা। মামারা নিয়ে গেল তাদের আস্তানায়। মামাদের ছিল দুধের ব্যবসা। ছিল বড়ো একটা খাটাল। সেই খাটালে জুটে গেল গােলামি। তা সেই গােলামিটাই বরাবর করতে পারতাম। কিন্তু বাদ সাধল ফকির সাধুখা। আমাকে মাইনের লােভ দেখিয়ে ভাগিয়ে নিয়ে এল দোকানের কাজে। এই দোকানে বসেই বেচা-কেনার রহস্যটা আমার কাছে কিছুদিনের ভেতর জলের মতন পরিষ্কার হয়ে গেল। এই জ্ঞানটুকু আসবার পর থেকে নিজেই আরম্ভ করলাম ব্যবসা। গােটা পঞ্চাশেক কলম আর ডট পেনসিল নিয়ে উঠে পড়লাম একদিন ট্রেনে। ঘণ্টাতিনেক ঘােরাঘুরি করে প্রায় সবকটি কলমই বিক্রি করে ফেললাম। এই বিক্রয়ে নগদ লাভ হল আট টাকা আশি পয়সা। ব্যস্, এর পর আমায় পায় কে?

প্রতিদিনের জীবন: জব্বারের সেই থেকে হকার। পাকা হকার। সপ্তগ্রামের বস্তির ছােট্ট একটি ঘর আমার দখলে। ভাের পাঁচটার সময় এই শর্মার ঘুম ভাঙে। ঘুম থেকে উঠে প্রাতঃকৃত্য সেরে এবং দুটি ভিজানাে ছােলা খেয়ে জব্বার হকার বেরােয় হকারি করতে। ছােলা খেলে দম বাড়ে। তাই ভরা দম নিয়ে জব্বার বেলা দশটা পর্যন্ত, কলমের ঝােলা নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। একে একে পার করে সে সকাল ৭ টার বর্ধমান লােকাল, সাতটা পনেরাের কাটোয়া, দুটি শেওড়াফুলি এবং দুটি তারকেশ্বর সমেত একটি সালার প্যাসেঞ্জার ট্রেন। বেলা সাড়ে দশটার লােকালে নিজের ডেরায় ফিরে এসে জব্বার রান্নাবান্না করে এক পেট খেয়ে একটু বিশ্রাম করে। ঘুমােয় সে পাকা দুটি ঘন্টা। তারপর সােমেদের ক্লক ঘড়িতে টং টং করে তিনটা বাজার সঙ্গে সঙ্গে আবার জব্বার এক পায়ে খাড়া। তার যাত্রা আবার শুরু হয়। রাত সাড়ে ন’টা পর্যন্ত এই খগেশ্বর দৌড়য় কখনও আপে, কখনও ডাউনে। কখনও ইলেকট্রিক লােকালে, কখনও ডিজেল ইঞ্জিনের কাঠের গাড়িতে। সেই বেসুরাে গলার সুরেলা ডাক এবং সেই কান-এঁটো-করা হাসি। খরিদ্দারেরা জব্বারকে দেখলে খুশি হয়। জব্বারও তাদের দেখে খুশি।

হিসাব মনস্কতা: রাত সাড়ে ন’টার পর ডেরায় ফিরে এসে জব্বার বসে যায় তার বিক্রি করা টাকার হিসাবে। জমা-খরচের হিসাব করে। মেলায় পুজিপাটা। তা লাভটা জব্বার ইদানীং ভালােই করে থাকে। যেদিন ভালাে হয়, সেদিন টাকা পনেরাে হয়। আর খুব খারাপ হলে টাকা হিসাব মনস্কতা পাঁচেক। আর বেরােতে না পারলে একেবারেই ফক্কিকার। শূন্য। ছুটির দিনগুলিতে সাধারণ মানুষরা ট্রেনে যায়। তাঁদের কাছে একটু বেশি দামই হাঁকে জব্বার । এইভাবে কোনাে কোনাে সময় একটু বেশিই রােজগার করে সে। জব্বার খুবই হিসেবি। সুদিনের থেকে দুর্দিনের কথাটিকে বেশি করে সে ভাবে।

সংসার করার ইচ্ছা: এদিকে দু’বেলা হাত পুড়িয়ে খেতে আর ভালাে লাগে না। ভাবছি , আমি জব্বার শর্মা, এবার একটি বিয়ে করব। দু এক জায়গায় গিয়ে মেয়ে দেখেও এসেছি। এবং পছন্দও হয়েছে এক জায়গায়। —এই জব্বার পণপ্রথার বড়ােই বিরােধী। তাই মেয়ের বাপের কাছ থেকে একটি টাকাও সে পণ নেবে না। নিজের রােজগার করা পয়সাই সে খরচ করবে নিজের বিয়েতে। হয়তাে এই বৈশাখেই শুভ কাজটা হবে। তা জব্বারের বিয়েতে আপনারা আসবেন তাে?
“আমার নাম জব্বার,
হকার-কুলে একেশ্বর।
ট্রেনে-ট্রেনে বেড়াই ঘুরে
কভু কাছে কভু দূরে
লােকটি আমি মন্দ না।
কলম কিনেই দেখুন না।”

RELATED POSTS