ঋক বৈদিক যুগের রাজনৈতিক অবস্থা

পণ্ডিতরা বৈদিক যুগকে দুভাগে বিভক্ত করেছেন—ঋক বৈদিক যুগ ও পরবর্তী বৈদিক যুগ। ঋগ্বেদের অভ্যন্তরে আর্য সভ্যতার যে যুগের কথা বলা হয়েছে তাকে ঋক বৈদিক যুগ এবং পরবর্তী বেদসমূহ ও বৈদিক সাহিত্যে যে যুগের কথা বলা হয়েছে, পরবর্তী বৈদিক যুগ বলা হয়। মােটামুটিভাবে ঋক বৈদিক যুগের কালসীমা হল খ্রিঃ পূঃ ১৫০০-১০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ। ঋক বৈদিক যুগের প্রধান উপাদান হল ঋগ্বেদ। ঋগ্বেদের অভ্যন্তরে ঋক বৈদিক যুগের চিত্র বিস্তৃত হয়ে আছে। এছাড়া, সাম্প্রতিককালে হস্তিনাপুর, অহিচ্ছত্র, অত্রঞ্জিখেরা প্রভৃতি স্থানে খননকার্যের ফলে প্রাপ্ত প্রত্নবস্তুগুলি আমাদের নানা তথ্য সরবরাহ করে, যদিও এগুলি বিশেষ নির্ভরযােগ্য নয়। তবুও এই সমস্ত উপাদানের ভিত্তিতে ঋক বৈদিক যুগের রাজনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে জানা যায়।

রাজতন্ত্রের উৎপত্তি: ঋক বৈদিক যুগে পরিবার ছিল সমাজের সর্বনিম্ন স্তর এবং এই পরিবারই ছিল রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি। কয়েকটি পরিবার নিয়ে গঠিত হত গোষ্ঠী। কয়েকটি গোষ্ঠী নিয়ে গঠিত হত উপজাতি। ঋক বৈদিক যুগে এই উপজাতি-ই ছিল সর্বোচ্চ রাজনৈতিক স্তর বা রাষ্ট্র। ঋক বৈদিক যুগের উপজাতি ও উপজাতীয় রাষ্ট্রগুলির মধ্যে উল্লেখযােগ্য ছিল সৃঞ্জয়, অনু, পুরু, ভরত, যদু, দ্রুহু ও তুর্বস প্রভৃতি। ঋক বৈদিক যুগে আর্য ও অনার্যদের মধ্যে যেমন সংঘর্ষ চলত, তেমনি ভূমি ও গাে-সম্পদের দখল নিয়েও বিভিন্ন আর্য গােষ্ঠীগুলির মধ্যে অবিরাম সংঘর্ষ চলত। এক কথায়, সামগ্রিক পরিস্থিতি ছিল বিশৃঙ্খলাপূর্ণ। এই অবস্থার অবসান ঘটানাে এবং যুদ্ধজয়ে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য একজন যােগ্যতাসম্পন্ন ও শক্তিশালী নেতার প্রয়ােজন দেখা দেয়। এইভাবেই ঋক বৈদিক সমাজে রাজতন্ত্রের উৎপত্তি ঘটে। ঋগ্বেদের ‘দশ রাজার যুদ্ধে’ আর্যদের দলগত সংগ্রামের উল্লেখ আছে। এই যুদ্ধে ভরতরাজ সুদাস দশটি আর্য রাজাদের মিলিত বাহিনীকে পরাস্ত করেন। এই যুদ্ধ আর্যদের রাজনৈতিক জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এই যুদ্ধের পর থেকে আর্যদের মধ্যে সার্বভৌম রাজশক্তির ধারণা সৃষ্টি হয়। অবশ্য দশ রাজার যুদ্ধের আগেই ভারতে ছােট ছােট রাজ্যের সৃষ্টি হয়েছিল।

শাসনতান্ত্রিক স্তর: পরিবার ছিল ঋক বৈদিক যুগের রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি এবং সর্বনিম্ন রাজনৈতিক স্তর। পরিবারকে বলা হত বিভিন্ন ‘কুল’ এবং এই কুলের প্রধান বা পরিবারের প্রাচীনতম পুরুষটিকে বলা হত ‘কুলপ’। কয়েকটি পরিবার নিয়ে গঠিত হত গ্রাম এবং গ্রামে প্রধানকে বলা হত গ্রামণী। কয়েকটি নিয়ে গঠিত হত ‘বিশ’ বা ‘জন’ এবং তার প্রধানকে বলা হত ‘বিশপতি’।

সম্রাট, একরাট, রাজচক্রবর্তী: ঋক বৈদিক যুগে সাধারণত রাষ্ট্রের আয়তন ছিল ক্ষুদ্র। অনেক সময় একটি গ্রাম নিয়েও একটি রাষ্ট্র গঠিত হত। এই যুগের শেষদিকে বৃহৎ রাষ্ট্রের উৎপত্তি পরিলক্ষিত হতে থাকে এবং রাজারা সম্রাট, একরাট, রাজচক্রবর্তী, অবিরাট, বিশ্বস্য ভুবনস্য রাজা বা বিশ্বভুবনের রাজা প্রভৃতি উপাধি ধারণ করতে থাকেন।

রাজার ক্ষমতা ও দায়িত্ব: সমাজ ও রাষ্ট্রে রাজা বিশিষ্ট স্থানের অধিকারী ছিলেন। তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী ও নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী। তিনি উজ্জ্বল পােশাক পরতেন, বড়াে বাড়িতে থাকতেন এবং অভিষেকের মাধ্যমে সিংহাসনে বসতেন। তার প্রধান কাজ ছিল বহিঃশত্রুর আক্রমণ ও অভ্যন্তরীণ শক্রদের হাত থেকে প্রজাবর্গের জীবন ও সম্পত্তির নিরাপত্তা বিধান করা। এছাড়া তাকে শাসনকার্য পরিচালনা, যুদ্ধ পরিচালনা, ধর্মরক্ষা, রাজস্ব আদায় প্রভৃতি কাজ করতে হত। তাকে যুদ্ধে যেতে হত এবং যুদ্ধজয়ই ছিল সিংহাসনের উপর তার অধিকারের শর্ত। এখানে মনে রাখা দরকার যে, ঋক বৈদিক যুগের রাজার সঙ্গে মেসােপটেমিয়া, সুমের বা ব্যাবিলােনিয়ার রাজার কিছু মৌল পার্থক্য ছিল। মেসােপটেমিয়ার রাজা ছিলেন দেশের প্রধান প্রশাসক ও প্রধান পুরােহিত। অপরদিকে ঋক বৈদিক যুগের রাজার দায়িত্ব ছিল সামরিক ও প্রশাসনিক। যাগযজ্ঞ ও ধর্মীয় কাজে তিনি ছিলেন পৃষ্ঠপােষক মাত্র। এ কাজের প্রধান ছিলেন পুরােহিত। বশিষ্ঠ ও বিশ্বামিত্র ছিলেন ঋক বৈদিক যুগের প্রভাবশালী পুরোহিত।

সভা ও সমিতি: রাজা সর্বশক্তিমান হলেও কখনােই স্বৈরাচারী ছিলেন না। তাকে সর্ববিষয়ে সভা ও সমিতি নামে দুটি প্রতিষ্ঠানের মত নিয়ে চলতে হত। এদের গঠন, ক্ষমতা ও কার্যাবলী সম্পর্কে বিস্তৃত এবং স্পষ্ট বিবরণ পাওয়া যায় না। মনে করা হয় যে, সভা ছিল বয়ােজ্যেষ্ঠ ও জ্ঞানবৃদ্ধদের প্রতিষ্ঠান। এখানে মহিলাদের প্রবেশাধিকার ছিল না। সমিতি-র অধিবেশনে গােষ্ঠীর সকল স্বাধীন মানুষই যােগ দিতেন। ডঃ রােমিলা থাপার বলেন যে, এমন বহু উপজাতি গােষ্ঠী ছিল, যাদের কোনও রাজা ছিল না। সেক্ষেত্রে উল্লিখিত সংস্থা দুটি শাসনকার্য পরিচালনা করত। সমিতির অধিবেশনে উপস্থিত থাকা রাজার অন্যতম কর্তব্য বলে বিবেচিত হত। রাজা সর্বদা তার বাগ্মিতা দ্বারা সমিতির সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করতেন। ঋকবেদের শেষ স্রোত্রে বলা হয়েছে যে, জনসাধারণ যেন ঐক্যবদ্ধ ভাবে সমিতির অধিবেশনে যান, (সংগছদ্ধম), এক সুরে কথা বলেন (সংবদধ্বম) এবং সহমন, সহচিত্ত ও সমানমন্ত্র হতে পারেন। প্রথমদিকে সমিতি রাজার ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করত।

রাজকর্মচারীগণ: রাজাকে শাসনকার্যে সাহায্য করতেন পুরােহিত, সেনানী, ব্রজপতি, গ্রামণী, গুপ্তচর, দূত প্রভৃতি কর্মচারীরা। সমাজ, ধর্ম ও রাষ্ট্রীয় কার্যে পুরােহিতের ভূমিকা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পুরােহিতের পরেই ছিল সেনানী বা প্রধান সেনাপতির স্থান। তার কাজ ছিল যুদ্ধকালে রাজাকে সাহায্য করা। শান্তির সময় তাকে অসামরিক কাজকর্ম করতে হত। গ্রামণী ছিলেন গ্রামের শাসনকর্তা। ব্রজপতি গােচারণভূমি দেখাশােনা করতেন। গুপ্তচররা রাজাকে রাজ্যের নানা বিষয়ে অবহিত করতেন। দূত কূটনৈতিক কাজে রাজাকে সাহায্য করত।

সামরিক ব্যবস্থা: সেনাবাহিনীর তিনটি পদ ছিল—পদাতিক, অশ্বারােহী ও রথারােহী বাহিনী। ঋক বৈদিক যুগে কোনও স্থায়ী সেনাবাহিনী ছিল না। প্রয়ােজনে একটি গােষ্ঠীর সব পুরুষই যুদ্ধযাত্রা করত। মেয়েরাও যুদ্ধে অংশ নিত। যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে তির-ধনুক, বল্লম, তলােয়ার, কুঠার, ঢাল, বর্ম, শিরস্ত্রাণ প্রভৃতি ব্যবহৃত হত। যুদ্ধাস্ত্রগুলি ছিল লৌহনির্মিত। অশ্বের প্রচলন ছিল। সামরিক বাহিনীর অঙ্গ হিসেবে হাতির কোনও উল্লেখ নেই। ঋগ্বেদে পুরচরিষ্ণু বা চলমান দুর্গের উল্লেখ আছে এবং এখান থেকে তির ও রথমুশল ছোঁড়া হত। সামরিক কর্মে নিযুক্ত ব্যক্তিদের অসামরিক কাজও করতে হত।

রাজস্ব ব্যবস্থা: ঋক বৈদিক যুগে কোনও নিয়মিত করব্যবস্থা গড়ে ওঠে নি। রাজার আয়ের উৎস ছিল ‘বলি’। ‘বলি’ কোনও কর নয়—দান, প্রণামি বা উপহার। প্রথমে বিশেষ বিশেষ উৎসব অনুষ্ঠানে রাজাকে ‘বলি’ পাঠানাে হত। এতে বাধ্যবাধকতা ছিল না–সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় পাঠানাে হত। পরে এই দান নিয়মিত ও আবশ্যিক হয়ে দাঁড়ায়।

বিচার ব্যবস্থা: পুরােহিত ও অন্যান্য কর্মচারীর সাহায্য নিয়ে রাজা বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। অপরাধীকে ধরে আনার জন্য পুলিশ ছিল — তাদের ‘উগ্র’ বলা হত। পারস্পরিক বিবাদে বিচার যিনি মধ্যস্থতা করতেন তাকে বলা হত ‘মধ্যমাসি’। গ্রামে বিচারকের কাজ করতেন ‘গ্রাম্যবাদিন’। রক্তপাতজনিত অপরাধের শাস্তি ছিল শতদায় বা একশােটি গরু।