ইতিহাস পাঠের উপকারিতা প্রবন্ধ রচনা

ইতিহাস কাকে বলে: ইতিহাস বলতে আমরা বুঝি অতীত দিনের কথা। অতীত দিনের কথার ভেতর লুকিয়ে রয়েছে আমাদের ধর্মের কথা, সমাজের কথা, সাহিত্য-সংস্কৃতির কথা, এবং এই সঙ্গে বড়াে বড়াে রাজারাজড়া এবং তাদের অবিরাম সংগ্রাম ইত্যাদির কথা। সাধারণ মানুষ, যাঁরা রুটি ও মকানের জন্য সংগ্রাম চালিয়ে গিয়েছেন, তাদের অতীত দিনের কথাও আমরা জানতে উৎসুক। বলা বাহুল্য, এ সবই হল ইতিহাসের এক্তিয়ারভুক্ত। ইতিহাস কেবল রাজারাজড়াদের অস্ত্রের ঝনঝনানি এবং তাদের জয়-পরাজয়ের ইতিবৃত্ত নয়, ইতিহাস হল মানুষের সবরকম সাফল্য ও পরাজয়েরও দলিল। ব্যক্তিগত রুচি এবং ব্যক্তিগত অনুসন্ধিৎসায় ইতিহাসকে যে যেমন চোখে দেখে, সে ঠিক সেইরকমভাবে দেখতে পায়। নেপােলিয়ন বােনাপার্ট ইতিহাসের রাজনৈতিক ঘটনাগুলিকে বড়াে করে দেখতে ভালােবাসতেন। এবং ইতিহাসের কোনাে কোনাে ঘটনাকে তার বানানাে কাহিনি অর্থাৎ fable বলে মনে হয়েছিল। তাই তিনি সকৌতুকে প্রশ্ন তুলেছিলেন— “What is history but a fable agreed upon?” —আর একজন বিখ্যাত ব্যক্তি এই ইতিহাসের মধ্যে অন্য এক সত্য আবিষ্কার করেছিলেন, তিনি হলেন The History of Mankind -এর রচয়িতা H.W. Van Loon.— তিনি মনে করতেন, “The history of the World is the record of a man in quest of his daily bread and butter.”

ইতিহাস দেশভেদ: বলে রাখা ভালাে, ব্যক্তিগত রুচিভেদে পাঠকেরা যেমন ইতিহাসের মধ্যে নিজের নিজের পছন্দনত দিকগুলি খুজে বের করতে চেষ্টা করে এবং সেগুলি পড়ে আনন্দ পায়, ইতিহাসও তেমনি দেশ কালভেদে নিজের নিজের স্বতন্ত্ৰরুপ নিয়ে দেখা দেয়। ইউরােপের ইতিহাসের সঙ্গে আমাদের ভারতের ইতিহাস তুলনা করলেই তা বােঝা যায়। ধনকুবের রথচাইডের সঙ্গে সর্বত্যাগী যিশু খ্রিস্টের জীবনীর যেমন মিল হয় না, এও অনেকটা সেইরকম। ইউরােপের জড়বাদী সভ্যতার সঙ্গে ভারতের অধ্যাত্মবাদী জীবনচর্যার পার্থক্য দুস্তর। তাই ইতিহাসের চরিত্রও আলাদা। আমরা ইতিহাস পাঠে যদি সত্যি সত্যিই উপকার পেতে চাই, তাহলে আমাদের নিজের দেশের অতীতকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জানা দরকার, অন্য দেশের না।

ভারত ইতিহাসে মূলকথা: আমাদের দেশের ইতিহাস কী বলে? আমাদের দেশের ইতিহাস কিন্তু আদৌ জড়বাদী সভ্যতার কথা বলে না। যদিচ অনেক রাজারাজড়ার কাহিনি আমাদের দেশের ইতিহাসে বিবৃত রয়েছে, কিন্তু তাদের রাজ্য সম্প্রসারণ, দ্বিগ্বিজয় ও যুদ্ধের সাফল্যকে কখনও আমাদের দেশ বাহবা দেয়নি। সেই রাজাই আমাদের দেশে বন্দিত হয়েছেন, যিনি মানুষের কল্যাণের জন্য নিজেকে সর্বতােভাবে বিলিয়ে দিয়েছেন। প্রিয়দর্শী অশােক, লােকপ্রিয় হর্ষবর্ধনের কথা আমাদের ইতিহাস সযত্নে ধরে রেখেছে। ইতিহাসপাঠ করে এদের লােককল্যাণের কথা আমরা জানতে পারি, এবং ভারতের ইতিহাসের জেনে গর্ববােধ হয়, আত্মবিশ্বাস বাড়ে। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য কীভাবে তার রাজ্যবিস্তার করেছিলেন, তা যেমন তার দৃঢ় চরিত্র-গৌরবের পরিচয় দেয়, অনুরূপভাবে তিনি যখন সর্বস্ব ত্যাগ করে জীবনের শেষপ্রান্তে অনশনে দেহত্যাগ করেন, তখন সুগভির অনাসক্ত বৈরাগ্যের একটি বিশেষ দিক চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য আমাদের সামনে তুলে ধরেন। কৌটিল্যর অর্থনীতি, সমুদ্রগুপ্তের সাহিত্যপ্রীতি, রাজা শশাঙ্কের চারিত্রিক দৃঢ়তা ইত্যাদির মধ্যে যেমন আমরা শিক্ষালাভ করি, অনুরূপভাবে ইতিহাসের পাঠক হিসাবে বুদ্ধদেব-শ্রীচৈতন্য প্রমুখের বিবরণ পাঠে আমরা ভারতবর্ষের লােকহিতের ও অলৌকিক প্রেমের সবিশেষ পরিচয় পাই।

ইতিহাস আমাদের অভিজ্ঞ করে। আমাদের বাঁচতে শেখায়। চলতে শেখায়। শেখায় সংকটের মােকাবিলা করতে। আমাদের বুঝতে শেখায় সমস্যা কীভাবে তৈরি হয় এবং কেন তৈরি হয়। আমাদের সুখ ও শান্তি কোন্ পথে পাওয়া যেতে পারে, তাও ইতিহাসের ইঙ্গিতে বােঝা যায়। বলদর্পীরা কী ভয়ংকরভাবে ব্যর্থ হন, এবং মহাকাল তাদের বিস্মৃতির আস্তাকুড়ে কীভাবে ছুঁড়ে ফেলে দেয়, তা ইতিহাস পাঠ না করলে কোনােরকমেই জানা যায় না। পক্ষান্তরে, মানবপ্রেম ও মানবসেবা কীভাবে সমাদৃত হতে পারে, তা ইতিহাসের পাঠই আমাদের জানিয়ে দেয়।

ইশারা: ইতিহাসের ঘটনাবলী যে পাঠক সুষ্টভাবে বিশ্লেষণ করতে পারেন, তিনিই ভবিষ্যতের কথা জানতে পারেন, এবং আগামী দিনের অনেকখানি পথও দেখতে পান। ইতিহাসই জানিয়ে দেয় যে, একজন রােমান সম্রাট দু’জন চোরের সঙ্গে যিশুখ্রিস্টকে ক্রুশবিদ্ধ করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। সেই সম্রাটের কথা আজ কেউ মনে রাখে না, মনে রাখে এবং শ্রদ্ধা করে সেই ক্রুশবিদ্ধ মানুষটিকে। বৈচিত্র্যের মধ্যেই যে ভারতের প্রকৃত ঐক্য নিহিত, তা ভারতের ইতিহাস খুটিয়ে পড়লেই জানা যায়। ভারতবর্ষ চিরকালই পরমতসহিষ্ণু, উদার, অতিথিবৎসল এবং সকলকে গ্রহণ করেই সে পূর্ণ। একথা ভারত ইতিহাসের পাঠক ছাড়া আর কে বােঝ? ইতিহাসের একজন মনােযােগী পাঠক ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ভারতবর্যের কথাতে তিনি বলতে পেরেছিলেন,—


“হেথায় আর্য
হেতায় অনার্য
হেথায় দ্রাবিড় চীন,
শক হুন দল পাঠান মুঘল
এক দেহে হল লীন।”

—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বর্তমান ভারতবর্ষে যারা বিচ্ছিন্নতাবাদী, তারা যদি ইতিহাসের থেকে পাঠ নিতেন, তা হলে একথা অতি সহজেই উপলব্ধি করতে পারতেন যে তারা বিপরীত পথে ছুটে সর্বনাশের দিকে এগিয়ে চলেছেন। ইতিহাস তাদের ক্ষমা করবে না।

স্মৃতি ও বিস্মৃতি: পৃথিবীর ইতিহাস পাঠ করলেও এই একই শিক্ষা হবে। সুবিশাল রােম সাম্রাজ্য টেকেনি, টেকেনি তৈমুর-চেঙ্গিসের লাখাে-খুনে রাঙানাে দস্যুতা। টেকেনি পাঠান-মুঘলদের সাম্রাজ্য, চোখের ওপর ইংরেজদের বিশ্বজোড়া সাম্রাজ্যও ভেঙে পড়ল তাসের ঘরের মতন। বলদর্পী হিটলার আজ স্মৃতিমাত্র। হারিয়ে গেছেন নেপেলিয়ান বােনাপার্ট। অথচ আশ্চর্যভাবে দিনদিন উজ্জ্বল হয়ে উঠছেন খ্রিস্ট, বুদ্ধ, নানক, চৈতন্য, কবির। আমরা সযত্নে পড়ছি হােমার-মিলটন-শেকসপিয়র-গ্যেটে-রবীন্দ্রনাথ, বাল্মীকি-ব্যাসদেব-কালিদাস-টলস্টয়। ইতিহাস এভাবে স্মৃতি-বিস্মৃতির খেলা খেলছে কেন? ইতিহাস পাঠ করলে জানা যায়, এ স্মৃতি-বিস্মৃতির রহস্য। জানা যায় কোনটি গ্রাহ্য, আর কোনটি পরিত্যাজ্য। ইতিহাস পাঠ তাই আমাদের জীবনে খুবই জরুরি।

RELATED POSTS