আমার দেখা একটি পৌষ মেলা প্রবন্ধ রচনা

আমাদের এই বাংলাদেশে অনেক অভাব আছে, কিন্তু অভাব নেই মেলার। আমাদের গ্রামে গঞ্জে সারা বছর ধরেই দেখা যায় মেলার পর মেলা। কোথাও রয়েছে ঝাপানের মেলা। কোথাও রয়েছে গাজনের। এ ছাড়া শীতের মেলা, ধর্মঠাকুরের মেলা, বৈশাখী মেলা, গঙ্গাসাগরের মেলা, চড়কের মেলা, কেঁদুলির মেলা ইত্যাদি নানা মেলার মালায় আমরা সর্বদাই অলংকৃত। তা এসব যত মেলাই থাকুক না কেন, শান্তিনিকেতনের পৌষমেলা সকলের থেকে আলাদা। এ মেলার চরিত্র আর পাঁচটি মেলার মতন নয়। বাংলাদেশের প্রামীণ মেলার সব উপকরণই এখানে আছে, অথচ পুরােপুরি এটিকে গ্রামীণ মেলা বলা যায় না। এ মেলায় শহরের ছোঁয়া আছে। আছে আধুনিকতার প্রভাব। অথচ এটি গ্রামীণ। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের নির্দেশে এ মেলার প্রতিষ্ঠা, এবং এই মেলার রূপায়ণে রয়েছেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সুতরাং, অসাধারণ কিছু বৈশিষ্ট্য যে এই মেলায় থাকবে, তাতে আর সন্দেহ কী !

পৌষ মেলার সূচনা: ১৮৯১ সালের ৭ ই পৌষ তারিখে শান্তিনিকেতনে ব্রহ্ম মন্দির স্থাপিত হয়। পৌষ উৎসবের সূচনা ঠিক ওই তারিখ থেকেই। তবে মেলার আরম্ভ হয় আরও তিন বছর পরে। ১৮৯৪ সালের ৭ ই পৌষ মেলার উদ্বোধন হয় আনুষ্ঠানিকভাবে। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের ‘ন্যাস-পত্র’ বা ‘ট্রাস্ট ডিডে’র নির্দেশ অনুসাৱে ধৰ্মাৰ উদ্দীপনার জন্য এ মেলার প্রবর্তন। দেবেন্দ্রনাথ মেলার প্রবর্তক হলেও সশরীলে তিনি এ মেলায় কখনও যােগদান করতে পারেননি। একশো মাইল দূরের কলকাতা থেকে তিনি যে নির্দেশ পাঠাতেন, সেইভাবে মেলা পরিচালিত হত। ১৯০৫ সালের ১৯ শে জানুয়ারি মহর্ষির দেহান্তর হয়। মেলার সূচনা থেকে দশ বছর কাল তিনিই ছিলেন মেলার রূপকার। আর এই মেলার ভেতর থেকে যিনি এই মেলার প্রাণসঞ্চার করতেন, তিনি হলেন রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং। অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ ছিলেন এই মেলার প্রাণপুৰুষ। বহু মানুষের সমাগমে মেলার প্রাঙ্গণ সেদিন গনগমিয়ে উঠত। বিভিন্ন ধরনের মানুষের সঙ্গে বিভিন্ন মানুষের মেলামেশা এখানে হত। পল্লিবাসী ভুলে যেত তাদের ক্ষুদ্রতা এবং সংকীর্ণতা। আর শহরাগত মানুষেরা ভুলে যেত তাদের নাগরিক উন্নাসিকতা। দেশি লােকের সঙ্গে দেশি ধারায় মিলিত হতেন সকলে। যে শান্ত নিরীহ পল্লিবাসীরা নিভৃত জীবনে অভ্যস্ত ছিলেন, তারা বৃহৎ জগতের রক্ত চলাচল অনুভব করার সুযােগ পেতেন। যাই হােক এইরকম একটি আদর্শ নিয়ে শান্তিনিকেতনের পৌষমেলার সূচনা হয়েছিল।

পৌষ মেলার বৈচিত্র্য: গত একশাে বছর ধরে এই মেলা চলেছে। আজও চলছে। কেমন চলছে বললে ভুল হবে, ওই মেলা আজ এক বেগবতী নদীর মতন সমৃদ্ধ। এই মেলা আজ সারা বাংলা তথা সমগ্র ভারতের একটি মিলনমেলা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই মেলার প্রথমপর্বে রবীন্দ্রনাথ নিজেই মেলায় আসা পল্লিবাসীদের মনােরঞ্জনের জন্য প্রবর্তন করেছিলেন যাত্রা, কথকতা, কীর্তন, বায়ােস্কোপ, ম্যাজিক লণ্ঠন, ব্যায়াম এবং ভােজবাজির মতন নানা অনুষ্ঠানের। এ ছাড়া নানা ধরনের দোকানপাট তাে ছিলই। গ্রামের ভেতর থেকে বিস্তর লােক আসতেন মেলার হাট থেকে প্রয়ােজনীয় জিনিস সওদা করতে। ধামা-কুলাে-ঝুড়ি ইত্যাদি কেনার সঙ্গে শৌখিন উপকরণ কিনতেন গ্রামের মানুষেরা। মেয়েরা কিনতে আসত কাচের চুড়ি, রঙিন শাড়ি, চুল বাঁধার-চিরুনি এবং নানান ধরনের প্রসাধন সামগ্রী। এরা কিনতেন গালার খেলনা। ফলের মোরব্বা, মাটির পুতুল, তেলেভাজা, ফুলুরি, চিনেবাদাম ভাজা ধীরে ধীরে একদা মেলার অঙ্গ হয়ে উঠল। পরে এল পৌষ নাগরদোলা। নিস্তরঙ্গ ও শান্ত পল্লীজীবনকে এই মেলা রীতিমতাে মাতিয়ে তুলল। কথকতা ও কীর্তনের কথা আগেই বলা হয়েছে, প্রায় সঙ্গে সঙ্গে এল বাউলের দল। এল সাঁওতালি নাচ। এইসঙ্গে ইংরেজি নাটক, প্রদর্শনী ইত্যাদি এল। কুটিরশিল্পের অবাধ অনুপ্রবেশও দেখা গেল। দেখা গেল, দিনের বেলায় মেলার জীবন একরকম, রাত্রিতে আর-এক রকম। রাত্তিরের মেলা আলােকিত হয়ে উঠত আতশ বাজিতে। শান্তিনিকেতনের পৌষমেলা আজ একটি মহামেলায় পরিণত হয়েছে। পঞ্চাশ বছর আগে এ মেলায় হয়তাে সাকুল্যে হাজার চল্লিশেক লােকের সমাগত হত, আজ সেই মেলায় সমাবেশ হয় লক্ষ লক্ষ লােকের। এখানে বিস্তর জিনিসের কেনাবেচা হয়। মাটির হাড়ি-কলসি থেকে আরম্ভ করে দরজা-জানলা, খাট-পালঙ্ক, লােহা ও স্টিলের বাসনপত্র, নানা ধরনের জামা-কাপড়, শাল, টুপি, রেডিও, টিভি, জন্তু-জানােয়ার পর্যন্ত কেনাকাটা করা যায়। আগে মেলা বসত আশ্রমের ভেতর। পূর্বপল্লির মাঠে। পরে ওখানে জায়গায় সংকুলান হল না। তাই পরে মেলা সরে এল শান্তিনিকেতনের বাইরে, বিশাল মাঠে। এখন জায়গার অভাব নেই। এখন এই মেলাটি সারা বাংলার মিলনতীর্থ।

পৌষ মেলায় মনীষী সমাগম: শান্তিনিকেতনের এই পৌষমেলা আজ এক ইতিহাসের সামগ্রী। এই মেলা কেবল সাধারণ মানুষের মিলনকেন্দ্র হয়ে ওঠেনি, এই মেলাটিতে বহু অসাধারণ মানুষকে আসতে দেখা গেছে। তারা সকলেই এই মেলাকে জীবনের পরম অভিজ্ঞতা বলে গ্রহণ করেছেন। আমাদের দেশে এমন কোনাে কবি-সাহিত্যিককে আমরা দেখি না, যারা এ মেলায় আসেননি। জগদীশচন্দ্রের মতাে বিজ্ঞানী, অন্নদাশঙ্কর ও লীলা মজুমদারের মত সাহিত্যিকেরা এবং সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের মত কবি এই মেলায় বহুবার হাজির থেকেছেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু এবং তার কন্যা ইন্দিরা গান্ধি এই মেলায় বহুবার উপস্থিত থেকেছেন। বহু বিখ্যাত গায়ক এবং নট ও নাট্যকারেরাও এই মেলা দু’চোখ ভরে দেখেছেন। রবীন্দ্রনাথ নিজে এই মেলায় উপস্থিত না-থাকতে পারলে কতখানি যে দুঃখ পেতেন, ত্য ভাবাই যায় না। ১৯২৪ সালের ৭ ই পৌষ রবীন্দ্রনাথ আর্জেন্টিনায় আটকে যান। দেশে ফিরতে পারেননি। এজন্য তার দুঃখের শেষ ছিল না। তিনি এন্ডুজ সাহেবকে চিঠি লিখে তার এই দুঃখের কথা জানিয়েছিলেন। ১৯৯৪ সালে এই পৌষ মেলার শতবর্ষ পূর্তি হয়।

RELATED POSTS