অশোককে একজন মহান সম্রাট বলা হয় কেন?

অশােক শুধুমাত্র ভারতের ইতিহাসে নয়, বিশ্ব ইতিহাসে এক অনন্য সাধারণ ব্যক্তি। তিনি রাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে যে মহান কৃতিত্বের পরিচয় রেখে গেছেন তা সশ্রদ্ধ চিত্তে স্মরণীয়।

কলিঙ্গ যুদ্ধ ও তার পরিণতি: প্রথম জীবনে অশােক ছিলেন শিবের উপাসক। পূর্বপুরুষদের রাজ্য বিস্তার নীতি অনুসরণ করে তিনি কলিঙ্গ রাজ্য সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন। কিন্তু এই যুদ্ধের হত্যালীলা তাকে ব্যথিত করে। তিনি এর পর উপগুপ্ত নামে এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর কাছে বৌদ্ধধর্মে দীক্ষা নেন। কিন্তু এর ফলে তার ব্যক্তিগত কর্মজীবনেই পরিবর্তন ঘটেনি, রাষ্ট্রীয় নীতির ক্ষেত্রেও এক মানবতাবাদী আচরণ বিধি প্রবর্তন করেন। রাষ্ট্রজীবনে তিনি যে মৌলিক রূপান্তর ঘটিয়েছিলেন তা ধর্ম বিজয় নীতি নামে পরিচিত।

প্রকৃতি: অশােক অনুসৃত রাষ্ট্রনীতি বৌদ্ধধর্ম ভিত্তিক ছিল কিনা তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। ফ্লিট মনে করেন অশােকের ধর্ম ছিল একান্তভাবে নীতি মূলক। রিজ ডেভিডস -এর ধারণায় অশোকের অনুসৃত ধর্মকে কোন বিশেষ ধর্ম না বলে নৈতিক কর্তব্য পালনের নীতি বলাই যুক্তিযুক্ত। অন্যদিকে ভাণ্ডারকর, জ বড়ুয়া হেমচন্দ্র রায় চৌধুরী প্রমুখ ঐতিহাসিকদের অভিমত হল অশােক প্রকৃত অর্থে বৌদ্ধধর্মে প্রকৃত দীক্ষিত হয়েছিলেন এবং তাঁর অনুসৃত নীতিকে বৌদ্ধধর্মের প্রয়ােগ বলা চলে।

পালনীয় আচরণ বিধি: কিন্তু অশােক যে ধর্ম প্রচার করেছিলেন তা বৌদ্ধ ধর্মের তুলনায় অনেক বেশী উদার মানবতাবাদী বলা যায়। তার প্রচারিত ধর্ম নিছক কোন বিশেষ গােষ্ঠীর ধর্ম ছিল না। নানা ধর্মের সার কথাগুলি স্থান পেয়েছিল তার ধর্মে। ডঃ রাধাকুমুদ মুখােপাধ্যায়ের বক্তব্য হল অশোক তার ধর্মে ব্যক্তিগত ও সমাজ জীবনকে পরিশুদ্ধ করতে চেয়েছিলেন। অশোক তার দ্বিতীয় ও সপ্তম স্তম্ভলিপিতে ব্যক্তিজীবনকে সুপথে পরিচালনার জন্য কতকগুলি আচরণ বিধি নির্দিষ্ট করেছিলেন। এগুলির মধ্যে উল্লেখযােগ্য হল প্রাণী হত্যা থেকে বিরত থাকা, পিতা-মাতা ও গুরুজনদের প্রতি ভক্তি ও শ্রদ্ধা জ্ঞাপন, অহিংসা পালন, দাস ও ভৃত্যদের প্রতি সৎ ব্যবহার প্রদর্শন। অশােক প্রজাদের বলেছেন এই সব আচার আচরণ মেনে চললে জীবন কলুষমুক্ত হবে।

কিন্তু অশােক রাষ্ট্রীয় জীবনেও ধর্মীয় অনুশাসনের প্রয়ােগ করতে চেয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘সব মুনিষে প্রজা মম’ অর্থাৎ সব মানুষই আমার সন্তান। তার লক্ষ্য ছিল প্রজাবর্গের এমনকি জীব জগতের কল্যাণ সাধন এবং তাদের ইহলৌকিক ও পারলৌকিক মুক্তির পথ সুগম করা।

অশােক তার ধর্মনীতি রূপায়ণের জন্য নানা কার্যকর ব্যবস্থা নিয়েছিলেন। অশােক প্রচলিত বিহার যাত্রার পরিবর্তে ধর্মযাত্রা’র ব্যবস্থা করেন, প্রজাদের নৈতিক উন্নতি সাধনের জন্য ধর্ম মহামাত্র নামে কর্মচারী নিয়ােগ করেন। যুত, রাজুক ও মহামাত্র প্রভৃতি কর্মচারীদের প্রতি ৩ অথবা ৫ বৎসর অন্তর তাদের নির্ধারিত এলাকা পরিভ্রমণ করে প্রজাদের অভাব অভিযােগ নিরসনের নির্দেশ দেন। এছাড়া, অশােক প্রাণী হত্যা নিবারণের আদেশ দেন। জনহিত কার্যকলাপ ছিল অশােকের রাজ কর্তব্যের অবশ্য পালনীয় অনুষঙ্গ। ইহলােকে প্রজাদের সুখ সাচ্ছন্দ্য বৃদ্ধির জন্য বৃক্ষরােপণ, কুপ খনন, দাতব্য চিকিৎসালয় স্থাপন প্রভৃতি কর্মসূচী গৃহীত হয়। বৌদ্ধধর্মের বিশুদ্ধ রক্ষার জন্যও অশােক সচেষ্ট ছিলেন। এইজন্য পাটলিপুত্রে তৃতীয় বৌদ্ধ সঙ্গীতি আহুত হয়। এই সম্মেলনে ধর্মীয় ক্ষেত্রে মতাদর্শগত বিরােধের নিষ্পত্তি ঘটে।

বৈদেশিক সম্পর্ক: অশােকের ধর্মনীতি বৈদেশিক নীতিকেও প্রভাবিত করেছিল। ধর্মপ্রচারের জন্য তিনি নিজপুত্র মহেন্দ্র ও কন্যা সংঘমিত্রাকে সিংহলে পাঠান। তাঁর নির্দেশে ধর্ম প্রচারকগণ দক্ষিণের চোল, কেরল, পাণ্ডদেশে ও ভারতের বাইরে মিশর, সিরিয়া, ম্যাসিডন ও এপিরাসে গিয়েছিলেন।

অশােকের ধর্মনীতির গুরত্ব: অশােকের অনুসৃত ধর্মনীতির সাফল্য সম্বন্ধে কোন দ্বিমত থাকতে পারে না। তার ধর্মনীতির মূল কথা ছিল সহনশীলতা। সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি প্রতিষ্ঠায় অশােক সাফল্য লাভ করেন। একটি ধর্ম, একটি ভাষা ও একটি লিপি (ব্রাহ্মী) দিয়ে সমগ্র দেশে ঐক্যের জাল বুনেছিলেন। (২) অশােকের ধর্ম বিজয় নীতির মর্ম কথা ছিল শান্তি ও অহিংসা। এই নীতি অনুসরণ করে অশােক বিশ্ব ইতিহাসে এক উজ্জ্বল ও মহান দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। এইজন্য প্রখ্যাত লেখক এইচ. জি. ওয়েলস অশােককে ‘ইতিহাসের পৃষ্ঠায় হাজার হাজার নৃপতিদের মধ্যে অশােকই একমাত্র উজ্জ্বল তারকা’ বলে উল্লেখ করেছেন।

উপসংহার: অনেকে অশোককে রােমান সম্রাট কনস্টানটাইন ও মুঘল সম্রাট আকবরের সঙ্গে তুলনা করেছেন।একথা সত্য, রোমান সম্রাট কনস্টানটাইন যেমন খ্রীষ্টধর্ম প্রচারে আত্মনিয়োগ করেছিলেন, সেরকম অশোক বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারে সচেষ্ট হয়েছিলেন। কিন্তু কনস্টানটাইন রোমান সাম্রাজ্যেকে শক্তিশালী করার উদ্দেশ্য নিয়েই খ্রীষ্টধর্ম প্রচারের নীতি গ্রহণ করেছিলেন। অন্যদিকে অশােক রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের জন্য বৌদ্ধধর্মের প্রসার ঘটান নি, জনকল্যাণ সাধন ছিল তার মূল লক্ষ্য। এছাড়া, আকবরের সঙ্গেও অশােকের তুলনা করা যুক্তিযুক্ত নয়। অশােক কলিঙ্গ যুদ্ধের পর বিস্তার নীতির পথ ত্যাগ করেন। অন্যদিকে আকবর সমস্ত জীবন ধরে অবিরাম বিস্তার নীতির মাধ্যমে মােঘল সাম্রজ্যের সম্প্রসারণ ঘটান। যদিও অশােক, আকবর দুজনেই সুশাসক ও পরধর্মসহিষ্ণু ছিলেন, কিন্তু আকবর অশােকের মত জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেন নি। তার প্রবর্তিত দীন-ই-ইলাহী ভারতে ধর্মীয় সংহতি সাধনে ব্যর্থ হয়েছিল, তাই অশােক ভারত তথা বিশ্ব ইতিহাসে এক অনন্য ব্যতিক্রমী মহান শাসক।

RELATED POSTS