অজাতশত্রু হর্যঙ্ক বংশের শ্রেষ্ঠ রাজা

বিম্বিসারের দ্বিতীয়া পত্নী লিচ্ছবি রাজকন্যা চেল্লনার গর্ভজাত পুত্র অজাতশত্রু। সিংহাসনে আরােহণের পূর্বে তিনি ছিলেন চম্পার শাসক। তার উপাধি ছিল কুণিক। তিনি ছিলেন হর্যঙ্ক বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক এবং তার আমলে হর্যঙ্ক বংশের গৌরব উচ্চতম সীমা স্পর্শ করে। পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে তিনি রাজ্

কোশলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ: তিনি প্রথমেই কোশল-রাজ প্রসেনজিতের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেন। কথিত আছে যে, অজাতশত্রু তার পিতা বিম্বিসারকে হত্যা করেন। এর ফলে প্রসেনজিৎ-ভগিনী কোশলদেবী স্বামীশােকে প্রাণত্যাগ করলে ক্ষুব্ধ প্রসেনজিৎ যৌতুক হিসেবে প্রদত্ত কাশী পুনর্দখল করেন। এই কারণে অজাতশত্রু প্রসেনজিতের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেন। এটি যুদ্ধের প্রকৃত কারণ হলেও এর পরােক্ষ কারণ ছিল আরও গভীরে। সমকালীন রাজনীতিতে কোশল যথেষ্ট শক্তিশালী রাজ্য ছিল এবং এই কারণে মগধ ও কোশলের মধ্যে প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল। বিম্বিসার বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করে কোশলের শক্তিকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন। অজাতশত্রুর আমলে অবস্থার পরিবর্তন ঘটে এবং দুইপক্ষ প্রকাশ্য সংঘর্ষে অবতীর্ণ হয়। বেশ কিছুদিন যুদ্ধ চলার পর অজাতশত্রু প্রসেনজিতের হাতে বন্দি হন। প্রসেনজিৎ তার কন্যা ভজিরা কুমারীর সঙ্গে অজাতশত্রুর বিবাহ দেন এবং বিবাহের যৌতুক হিসেবে কাশী অজাতশত্রুর হাতে তুলে দেওয়া হয়। এরপর থেকে কোশলের দ্রুত পতন ঘটতে থাকে।

লিচ্ছবিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ: বৈশালীর লিচ্ছবি-রাজকন্যার পুত্র হয়েও অজাতশত্রু লিচ্ছবি রাজ্যের বিরুদ্ধে তার যুদ্ধ ঘােষণা করেন। যুদ্ধের কারণ নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে মতপার্থক্য আছে। অনেকে বলেন যে, এই যুদ্ধের কারণ হল লিচ্ছবি-রাজ চেতক অজাতশত্রুর বৈমাত্রেয় ভ্রাতাদের তার রাজ্য আশ্রয় দিলে দু’পক্ষে বিবাদ বাধে। বৌদ্ধ জাতক অনুসারে গঙ্গার উপর একটি বন্দর ও একটি সোনার খনির অধিকার নিয়ে মগধ-বৈশালী বিরােধের সূচনা হয়। ডঃ ব্যাসাম এর মতে গঙ্গার উত্তর উপকূল দখল করাই ছিল অজাতশত্রুর মূল লক্ষ্য। ডঃ হেমচন্দ্র এই রায়চৌধুরী বলেন যে, এই যুদ্ধের প্রকৃত কারণ হল মগধের নবােদিত সাম্রাজ্যবাদকে দমনের জন্য প্রজাতান্ত্রিক রাজ্যগুলির ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস। মল্ল, বৃজি এবং পূর্ব ভারতের ছত্রিশটি গণরাজ্য লিচ্ছবি নায়ক চেতকের নেতৃত্বে মগধের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ হয়। কোশল, বংস, অবন্তী, সিন্ধু-সৌবির প্রভৃতি রাজ্যও এই মৈত্রী-জোটে সামিল হয়।

অজাতশত্রু অনুসৃত নীতি: শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে জয়ের উদ্দেশ্যে অজাতশত্রু কয়েকটি ব্যবস্থা গ্রহণ করেন—
(১) লিচ্ছবি রাজ্যটি ছিল গঙ্গার তীরে। অপরপক্ষে, মগধের রাজধানী রাজগৃহ ছিল। গঙ্গা নদী থেকে অনেক দূরে — দেশের অভ্যন্তরভাগে। সেখান থেকে গঙ্গা তীরবর্তী লিচ্ছবি রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালানাে অসুবিধাজনক হওয়ায় অজাতশত্রু গঙ্গা ও শােন নদীর সঙ্গমস্থলে পাটলি গ্রামে একটি অস্থায়ী দুর্গ নির্মাণ করেন। পরবর্তীকালে এখানে মগধের রাজধানী পাটলিপুত্র নগরী গড়ে ওঠে।
(২) যুদ্ধজয়ের উদ্দেশ্যে অজাতশত্রু কুটনীতির আশ্রয় গ্রহণ করেন। তার মন্ত্রী বাসসাকর -এর প্রেরিত গুপ্তচরেরা গণরাজ্যগুলির ঐক্যে ফাটল ধরায়।
(৩) অজাতশত্রু এই যুদ্ধে মহাশিলাকন্টক ও রথমুষল নামে দুটি নতুন ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করেন। প্রথমটি ছিল একটি উৎক্ষেপণ যন্ত্র, যা দিয়ে শত্রুসেনা লক্ষ্য করে বড়াে বড়াে পাথরের টুকরাে নিক্ষেপ করা হত। দ্বিতীয়টি হল তীক্ষ লৌহ-অলকযুক্ত এবং ধাতুনির্মিত এক ধরনের দুর্ভেদ্য রথ, যা শত্রুসেনার ভিতর দিয়ে চালিয়ে দিলে তীক্ষ্ণ ফলার আঘাতে শত্রুসেনারা সহজেই নিহত হত। খ্রিস্টপূর্ব ৪৮৪ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ৪৬৮ অব্দ পর্যন্ত দীর্ঘ ষােলাে বছর ধরে যুদ্ধ চলার পর পূর্ব ভারতের গণরাজ্যগুলির পতন ঘটে। এগুলি মগধের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং অজাতশত্রু বৈশালী জয় করেন। এর ফলে সমগ্র উত্তর বিহার মগধ সম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং সমগ্র পূর্ব ভারতে মগধের একাধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়।

অবন্তী-রাজের শত্রুতা: অজাতশত্রুর শক্তিবৃদ্ধিতে অবন্তী-রাজ প্রদ্যোৎ ঈর্ষান্বিত হয়ে ওঠেন। তিনি মগধ আক্রমণের পরিকল্পনা করলে অজাতশত্রু রাজধানী রাজগৃহের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করেন তবে এ সময় দু’পক্ষে যুদ্ধ হয়েছিল কিনা, বা তার ফলাফল কী হয়েছিল তা জানা যায় না।

ধর্মমত: বিভিন্ন বৌদ্ধ ও জৈন গ্রন্থাদিতে অজাতশত্রুকে নিজ নিজ ধর্মের অনুরাগী বলে দাবি করা হয়েছে। প্রথম জীবনে বৌদ্ধ বিদ্বেষী হলেও পরবর্তীকালে অজাতশত্রুর মনােভাবে পরিবর্তন আসে এবং তিনি বুদ্ধদেবের শরণাপন্ন হন। শিলালেখ-তে বুদ্ধদেবের সঙ্গে তার সাক্ষাৎকারের চিত্র খােদিত আছে। তিনি রাজগৃহের চারদিকে বেশ কয়েকটি চৈত্য নির্মাণ করেন এবং ১৮ টি বৌদ্ধবিহার সংস্কার করেন। বুদ্ধদেবের তিরােধানের পর রাজগৃহে যে প্রথম বৌদ্ধ সংগীতির অনুষ্ঠান হয়, তাতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেন। এই অধিবেশনে যােগদানকারী ভিক্ষুদের প্রয়ােজনীয় দ্রব্যাদি সরবরাহের দায়িত্ব তিনি গ্রহণ করেন। জৈন ধর্মের প্রতিও তিনি যথেষ্ট শ্রদ্ধাশীল ছিলেন এবং মহাবীরের সঙ্গে তার একাধিকবার সাক্ষাৎ ও কথাবার্তা হয়।

RELATED POSTS